ঢাকাবুধবার, ৩০শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বিষপান, দুই বছর শিকলবন্দি জসিম

ইমরান রহমান অনিম
জুলাই ৫, ২০২২ ৫:০৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জসিম উদ্দিন (২৬) স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় ভালোবাসতেন এক মেয়েকে। সেই প্রেমের সম্পর্ক বেশি দিন পর্যন্ত গড়ায়নি। প্রেমের সম্পর্ক হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিষপান করে পাশের একটি গ্রামে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। জসিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। তবে চিকিৎসা শেষে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন তিনি। গত দুই বছর ধরে শিকলবন্দি রয়েছে তার জীবন।

শিকলবন্দি যুবক জসীম উদ্দীনের বাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের চাড়ালকান্দি গ্রামের মৃত নিজাম উদ্দিনের ছেলে।


এলাকাবাসী জানান, জসিম উদ্দিন পড়াশোনায় ছিলেন অদম্য মেধাবী, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় রেজাল্টও ভালো করেছিলেন। জসিম স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় ভালোবেসে ছিলেন এক মেয়েকে। সম্পর্ক বেশি দিন পর্যন্ত গড়ায়নি। প্রেমের ব্যর্থ হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। ভুলে থাকার সহজ সমাধান খুঁজতে আসক্ত হয়ে পড়েন নেশায়। পারিপার্শ্বিক নানা মানসিকচাপের পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনও চলে তার ওপর। 

২০১৬ সালে চলাফেরা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে তার। হঠাৎ বিষপান করে পাশের একটি গ্রামে গিয়ে। সেখান থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা করে বাড়ি ফিরে আনলে পুরোপুরিভাবে হারিয়ে ফেলেন মানসিক ভারসাম্য। তারপর থেকেই শিকলে বাঁধা পড়ে মেধাবী জসীম।

সরেজমিনে জসীম উদ্দীনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি একটি ঘরে নোংরা একটি কাপড় গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেন জসিম। দুই পাশে বেড়া দিয়ে রয়েছে, আর কোনো বেড়া নেই। পায়ে শিকল লাগিয়ে একটি খুঁটির সঙ্গে বাঁধা রয়েছেন। কোনো কথা বলছেন না। এদিক-সেদিক শুধু তাকাচ্ছে। চারপাশে মশার উপদ্রব। কিন্তু সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টি এলে ভিজতে হয়। জসিমকে পুরনো কোনো স্মৃতির কথা বললে লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলে।

জসিম উদ্দিনের বাবা নিজাম উদ্দিন তিন বছর আগে মারা গেছে। বাড়িতে বড় এক ভাই ও মা থাকেন।‌ চার ভাই বোনের মধ্যে জসিম উদ্দিন হলেন সবার ছোট।

মা জরিনা বেগম বলেন, জসিম উদ্দিন ৬ বছর ধরে পাগল হয়েছে, আমার ছেলে আর নেই, জীবিত থেকেও মরা। আগে কিছুটা ভালো ছিলো এখন আরও অবস্থা খারাপ। ছেলে বেলা থেকেই পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলো। এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগে এই সমস্যা শুরু হয়। অসুস্থ হয়েও এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল; ভালো রেজাল্ট করেছে।

তিনি বলেন, ছেলের চিকিৎসায় সংসারের সবকিছু শেষ করেছি। তাকে চিকিৎসা করার মতো আমাদের আর কিছুই নেই। বেসরকারি হাসপাতালে কিছুদিন চিকিৎসা করেছি ১ লাখ টাকা লেগেছিল। কিছুটা ভালো হয়েছিল। টাকার অভাবে সেখান থেকে আবার নিয়ে আসতে হয়েছে। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসা করলে ভালো হবে। কিন্তু অর্থের অভাবে আর চিকিৎসা করাতে পারছি না। মানুষজন দেখলেই মারধর গালাগালি ও বাড়িতে ভাঙচুর শুরু করে। এই কারণে তার পায়ে শিকল পরিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে।

জসিম উদ্দিনের চাচা আমজাদ আলী বলেন, ছোটবেলা থেকে সে খুবই শান্ত ও মেধাবী ছিল। হঠাৎ করেই জসিম উদ্দিন পাগল হলো। ৩ বছর আগে তার বাবাটা ও মারা গেছে। অভাব অনটনের সংসারে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছেন না। চিকিৎসা পেলে সুস্থ হতে পারে জসিম।

প্রতিবেশী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগেও তিনি একটু ভালো ছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা বন্ধ হওয়ায় আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। উন্নত চিকিৎসা করা হলে সুস্থ হয়ে উঠবে।

মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিম মিঞা বলেন, জসিমের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে ওই পরিবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, সার্বিকভাবে সহায়তা করা হবে।