ঢাকাবৃহস্পতিবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে কেন উদ্বিগ্ন চীন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
জুলাই ২৮, ২০২২ ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি আগস্টে তাইওয়ান সফর করবেন বলে দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। যদিও পেলোসির তাইওয়ান সফরের সঠিক দিনক্ষণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে তার আসন্ন সফরের খবর জানার সঙ্গে সঙ্গেই চীন যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তার নজির বিরল।

চীনা সরকারি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন যে, এই সফর চীনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সামিল এবং এতে প্রমাণ হবে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘এক-চীন’ নীতি বর্জন করছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সোমবার বলেন, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগলিক অখণ্ডতা রক্ষায় শক্ত ব্যবস্থা নেবে চীন। তিনি বলেন, যে কোনো পরিণতির দায় নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।

চীনে বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক যে কোনো বিষয়ে সাধারণত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু মার্কিন স্পিকারের প্রস্তাবিত সফর নিয়ে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কড়া হুমকি শোনা গেছে সেদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে।

চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ট্যান কেফেই মঙ্গলবার চায়না ডেইলিকে বলেন, ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান গেলে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) চুপ করে বসে থাকবেনা এবং তারা যে কোনো পরিস্থিতির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তা বা রাজনীতিকরা একবারেই তাইওয়ানে যান না তা নয়। কিছুদিন আগেও সাবেক ট্রাম্প সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও তাইপে সফরে গিয়েছিলেন।

কিন্তু ন্যান্সি পেলোসি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনীতিকদের একজন। প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই তার অবস্থান। ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা তিনি।

মার্কিন রাজনৈতিক মহলে সবসময়ই তাকে কট্টর চীন-বিরোধী হিসেবে দেখা হয়। চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সব সময়ই সোচ্চার। চীন সফরে গিয়ে তিয়েনানমেন স্কয়ারে গিয়েছিলেন তিনি। নির্বাসিত চীনা ভিন্নমতালম্বীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা সবাই জানে।

ফলে এমন একজন ব্যক্তির তাইওয়ানে যাওয়ার এই পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি উসকানি হিসেবে দেখছে চীন।

বিশেষ করে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বর্তমান যে প্রেক্ষাপট তাতে এই সময়ে ন্যান্সি পেলোসির এই সফর চীনের ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

আর কয় সপ্তাহ পরেই চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কংগ্রেসে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং তৃতীয় মেয়াদের ক্ষমতার জন্য অনুমোদন চাইবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা সুজান এল শার্ক নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ঠিক এই সময়ে স্পিকার পেলোসির এই সফরকে শি জিনপিং এবং তার পার্টি তাদের জন্য অপমানজনক বলে বিবেচনা করতে পারে। এই কর্মকর্তা চীনা রাজনীতি নিয়ে একটি বইও লিখেছেন

তিনি বলেন, এই অপমান বোধ থেকে চিন্তা-ভাবনা না করে শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই বিশ্লেষক মনে করেন সংঘাতের ঝুঁকি না নিয়ে এখন এই সফর স্থগিত করাই সঠিক হবে।

তাইওয়ানকে চীন সবসময় অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে এবং তাইওয়ানের ব্যাপারে কোনো ধরণের শিথিল অবস্থান নেওয়া ক্ষমতাসীন কোনো চীনা রাজনীতিকের পক্ষে সম্ভব নয়। তা নিলে নিশ্চিতভাবে পার্টির রোষানলে পড়তে হবে।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর তাইওয়ান সরকারের সঙ্গে তার প্রশাসনের কূটনৈতিক সম্পর্ক যেভাবে বাড়ছে তাতে চীন উদ্বিগ্ন। গত এপ্রিলেই যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের ছয়জন সদস্য হঠাৎ তাইওয়ান সফরে যান। প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজে গত এক বছরে অন্তত তিনবার বলেছেন, তাইওয়ান আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা করবে না।

চীন এ নিয়ে একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ এবং উদ্বিগ্ন। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যে কয় দফায় দুই সরকারের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে সেখানে চীনারা তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।

তারপরেও ন্যান্সি পেলোসির এই সফরের পরিকল্পনাকে আগুনে ঘি ঢালার মতো একটি কাজ হিসেবে দেখছে চীন।

কিন্তু ন্যান্সি পেলোসি যদি এসব হুমকিতে কান না দেন চীনের কাছে বিকল্পে এখন কি রয়েছে?

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, চীনা সামরিক বিমান স্পিকার পেলোসিকে বহন করা বিমানকে ঘিরে তাইওয়ানের আকাশ সীমায় চলে যেতে পারে। যাতে তিনি তাইপেতে অবতরণ করতে না পারেন।

এমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপাত্র হিসাবে পরিচিতি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সাবেক প্রধান সম্পাদক হু শি জিন।

টুইটারে তিনি লিখেছেন, চীনা যুদ্ধবিমান পেলোসির বিমানকে ঘিরে প্রথমবারের মতো তাইওয়ান-নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় প্রবেশ করতে পারে। চীনকে এবার অবশ্যই শক্ত সামরিক ব্যবস্থার পথ নিতেই হবে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, মার্কিন কর্মকর্তারা এমন একটি সম্ভাব্য চিত্রপট নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর আগে ২০২০ সালে তৎকালীন মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যালেক্স আজার যখন তাইওয়ান সফরে যান তখন চীনা যুদ্ধবিমান তাইওয়ান প্রণালির মাঝ বারাবর তাইওয়ানের আকাশসীমার একদম প্রান্তে চলে গিয়েছিল। ইচ্ছাকৃতভাবে তাইওয়ানের বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে চীনা বিমানের চলে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল সেসময়।

এমনিতেই তাইওয়ান নিয়ে চীনের বক্তব্য-বিবৃতি, গতিবিধি নিয়ে বাইডেন প্রশাসন উদ্বিগ্ন। আমেরিকান রাজনীতিক এবং সামরিক প্রশাসকদের একাংশের মধ্যে একটি চিন্তা ঢুকেছে যে ইউক্রেন যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে চীনা নেতারা হয়তো মনে করছেন, তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আমেরিকা আরো জোরদার করার আগেই ওই দ্বীপকে জোর করে অঙ্গীভূত করে নিতে হবে।

এমন উদ্বেগের কথাও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে যে, চীনারা হয়তো যে কোনো সময় তাইওয়ান প্রণালীর পুরোটা অংশে অথবা অংশবিশেষে বাকিদের চলাচল বন্ধ করে দেবে।

জুন মাসেই চীন বলেছে, তাইওয়ান প্রণালীতে একমাত্র তাদেরই সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা অর্থনীতির যে বেহাল দশা এখন চলছে সেসময় স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর নিয়ে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি সংঘাতের ঝুঁকি কি আমেরিকা এখন নেবে?

প্রেসিডেন্ট বাইডেনের জন্য বিষয়টি শাঁখের করাতের মতো। তিনি যেখানে বারবার তাইওয়ানকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন তখনই আবার চীনের চাপে স্পিকার পেলোসিকে থামালে তাকে নিশ্চিতভাবে বিড়ম্বনায় পড়তে হবে।

তবে আমেরিকান প্রশাসনের মধ্যে বিতর্কিত এই সফর নিয়ে দোটানা স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট বাইডেন গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেছেন, সেনা কমান্ডাররা মনে করছেন, এই মুহুর্তে স্পিকার পেলোসির তাইওয়ান সফর ইতিবাচক হবে না।

মার্কিন মিডিয়াগুলো বলছে, হোয়াইট হাউজ এবং পেন্টাগনের পক্ষ থেকে স্পিকারের অফিসের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে তিনি যেন এখন এই সফর স্থগিত করেন।

অপরদিকে পেলোসির সফর নিয়ে মুখে উল্লাস প্রকাশ করলেও ভেতরে ভেতরে তাইওয়ানের সরকারও অস্বস্তিতে পড়েছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই সবসময় মার্কিন রাজনীতি এবং প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলেন। কিন্তু একই সঙ্গে এখানে চাপা উদ্বেগ রয়েছে যে স্পিকার পেলোসি এখন কেন আসছেন এবং তিনি এলে ভালোর চাইতে মন্দ বেশি হবে কিনা!

তাদের নিয়ে আসলে আমেরিকার নীতি ঠিক কী তা নিয়ে তাইওয়ানের মধ্যে এখনও অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রেসিডন্ট বাইডেন বলেছেন, তিনি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলবেন।

তিনি কি উত্তেজনা কমাবেন নাকি চীনের হুমকিকে অবজ্ঞার পথ নেবেন? সেই টেলিফোন আলাপের পরই হয়তো তার কিছুটা ইঙ্গিত মিলবে।