সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০ ইং, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ ও আমাদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-০৯-১৭ ১২:৫৯:৩৮ /
ভারতকে দেখুন, কী নোংরা: ডোনাল্ড ট্রাম্প

১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সাথে বিমাতাসূলভ আচরণ করে আসছিল। প্রথম আঘাত হানে বাংলা ভাষাকে হটিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা ঘোষণার মাধ্যমে। জীবনের বিনিময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ নিজেদের ভাষাকে রক্ষা করে। 

কিন্তু উচ্চ বিলাসী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী শোষণের দীর্ঘ পথ তৈরি করতে পাকিস্তান সৃষ্টির মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসে এবং পূর্ব পাকিস্তানিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে গণ্য করে এবং পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশী মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-বিশ্বাস-মূল্যবোধকে ধ্বংস করে সম্পূর্ণরূপে পরনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত করার জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যে জাতি ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম ও লড়াই করে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে সে জাতি পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রকে খুব সফল হতে দেয়নি। এরপরও পশ্চিমারা শিক্ষাকে ধ্বংস করার জন্য ১৯৫৮ সালে বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ করে। 

এ কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য সামরিক জান্তা আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এসএম শরীফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন করেন যা ‘শরীফ শিক্ষা কমিশন’ নামে পরিচিত। এ কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট সাতাশটি অধ্যায়ের একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এতে বেশ কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ ও আপত্তিজনক সুপারিশ পেশ করেন যা সুস্পষ্টভাবে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতির পরিচয়কে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র হিসাবে বিবেচিত হয়। 

শরীফ কমিশনের বিদ্বেষমূলক বিষয়গুলো হল :

১. ধর্মীয় শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। (কিন্তু এখানে উল্লেখ করা হয়নি ধর্মীয় শিক্ষা কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।)

২. আবাসিক মাধ্যমিক স্কুল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উৎসাহ দান করতে হবে। (এটিও অর্থনৈতিক বিবেচনায় সাংঘর্ষিক, কেননা আবাসিকের পুরো খরচ মিটানোর মত সে সময়ে প্রায় শতভাগ পূর্ব পাকিস্তানির পক্ষে অসম্ভব ছিল।)

৩. মাধ্যমিক স্তরে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি বাধ্যতামূলক।

৪. মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ব্যয় শিক্ষার্থীকে ষাট শতাংশ মিটাতে হবে।

৫. উচ্চ শিক্ষা কেবল মাত্র ধনী শ্রেণির জন্য নির্ধারিত করা হয়। (এ দু’টি সুপারিশের মূল লক্ষ্য হল শিক্ষিত-দক্ষ জনসমষ্টির চেয়ে শ্রমিক শ্রেণির জনসমষ্টি তৈরি করা।) 

৬. উচ্চ শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকার করবে।

৭. ১৯৫২ সালের সালাম-রফিক-বরকত-শফিউলের রক্তের বিনিময়ে ভাষা অধিকারকে সুকৌশলে পাল্টে দেয়ার জন্য বাংলা ভাষার কিছু অক্ষরকে পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়।

৮. শিক্ষকতা একটি সৃজনশীল ও মুক্তমনের পেশা, সেখানে শিক্ষকদের পনের ঘণ্টা কাজের বিধান প্রস্তাব করেছিল। (এ প্রস্তাব অমানবিক ও আন্তর্জাতিক লেবার আইনের সুস্পষ্ট পরিপন্থী।)

৯. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেয়া হল। এমন আরও বেশ কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ ধারা ও প্রস্তাবনা পেশ করে শরীফ কমিশন।

এ প্রতারণার বিরুদ্ধে ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আন্দোলন করেছে। কিন্তু সে আন্দোলন খুব সহজেই মোকাবিলা করেছে আইয়ুব সরকার। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম বার্ষিকী পালন নিষিদ্ধ করায় আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পূর্ব পাকিস্তানের সব ছাত্র সংগঠন বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন না করে ঐক্যবদ্ধভাবে  আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করে। ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেপ্তার হলে ছাত্ররা আরও দৃঢ়চিত্তে পাকিস্তানি হটকারীতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত আন্দোলন শুরু করে। 

ইতোমধ্যে পাকিস্তানি শাসকরা গণদাবীকে উপেক্ষা করে শরীফ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ঘোষণার কারণে সর্বদলীয় ছাত্র সংগঠনের ডাকে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। এ হরতালে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোও রাস্তায় নেমে আসে। সেদিন দুপুরে হাইকোর্ট এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ কোন কারণ ছাড়াই প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি বর্ষণ শুরু করে। আর এর ফলে মারা যায় বাবুল, গোলাম মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহ নামের ভিন্ন পেশার তিন জন নিহত হন এবং আহত হয় কমপক্ষে দু’শ পঞ্চাশ জন। টঙ্গীতে নিহত হয় সুন্দর আলী নামে একজন। 

এ রক্তের বিনিময়ে ১৯৬২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আইয়ূব সরকার বাধ্য হয় শরীফ শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ সমূহ বাস্তবায়ন বন্ধ করে দিতে। এ দিনটি আজও বাংলাদেশিদের কাছে শিক্ষা দিবস হিসাবে পরিচিত হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটিকে শিক্ষা দিবস হিসাবে ঘোষণা ও পালিত না হবার কোন কারণ কারো জানা নেই। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য সবার কাছে তুলে না ধরে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের একটি অংশকে অস্বীকার করার নামান্তর। 

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্বাধীনতার ঊনপঞ্চাশ বছর পর যখন এটি প্রতীয়মান হয় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শরীফ কমিশনের বেশ কিছু ধারা বিদ্যমান, যা আমাদের অর্জিত স্বাধীনতার গৌরবকে কলঙ্কিত করে। বিশেষ করে বাংলাদেশে গত দু’দশকে বাণিজ্যিকীকরণের শীর্ষ পণ্য হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পুঁজিবাদী সমাজ যেমন শিক্ষাকে কুক্ষিগত করেছে তেমনি সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।

শরীফ কমিশনের রিপোর্টে যেমন বলা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ তেমনি বাংলাদেশে এখন অলিখিতভাবে একদলীয় ছাত্র রাজনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে ছাত্রদের রক্ত বিসর্জনকে অস্বীকার করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কাগজে স্বায়ত্তশাসিত হলেও গত দু’দশক ধরে সরকার কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত। 

শরীফ কমিশন যেমন বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করার জন্য কিছু বাংলা অক্ষরকে পরিবর্তনের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাকে যেভাবে অবহেলা করা হয় তা পরোক্ষভাবে বাংলাকে ধ্বংস করার নামান্তর।

উল্লেখ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হিসাবে ইংরেজি ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার বাংলায় ডিগ্রি অর্জনকারীরা অন্যদের তুলনায় অনেক বেতনে চাকরি করতে বাধ্য হয়। এসব বিষয় ছাত্রদের ত্যাগের প্রতি অন্যায়  ও দেশের ভবিষ্যতকে ধ্বংসকারী উদ্যোগ ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হল স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হলেও কোনটি পরিপূর্ণভাবে যেমন বাস্তবায়িত হয়নি তেমনি সেগুলো কোনভাবেই স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যকে অর্জনে পরিপূরক নয়। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের শিক্ষা কখনো কোন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারেনি। বরং এ শিক্ষা ব্যবস্থা পরনির্ভর ও দাসত্বমূলক জনশক্তি তৈরি করতে নিয়োজিত। এমনকি বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অসংস্কৃতিকে সমর্থন করে দেশের প্রকৃত পরিচয়কেও ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। 

এ দৈন্যদশার জন্য দেশের বিরাজমান শাসনব্যবস্থা যেমন দায়ী তেমনি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কায়েমী স্বার্থবাদীদের দুর্নীতিও দায়ী। এমনকি এদেশের শিক্ষকরাও অবগত নন ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের তাৎপর্য সম্পর্কে। ফলে, শিক্ষার্থীরাও এ বিষয়ে অবগত হবার সুযোগ পাচ্ছেনা এবং তারা নতুন করে দেশকে সে সময়ের চেতনায় সাজাবার পরিকল্পনা তৈরি করতে পারছেনা। এ অবস্থার অবসান না হলে এ ব্যর্থতার দায়ে একদিন আমরা সম্পূর্ণরূপে পরনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত হতে বাধ্য। 


লেখক: মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।
ই-মেইল: jashimnub@yahoo.com



ডিসি/এসএসআর

সরকার করোনাভাইরাসকে ব্যবহার করে দুর্নীতির পাহাড় গড়েছে: ফখরুল