বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০ ইং, ১৩ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন: বৈষম্যমুক্ত শিক্ষার প্রতীক
মোহাম্মদ নূরুল আমীন প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-০৯-১৭ ১৫:৩০:৫৪ /
ফ্লাইট চালুর পর সৌদি ফিরেছেন ৩১ হাজার বাংলাদেশি

আজ ১৭ সেপ্টেম্বর; ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস। উচ্চশিক্ষা শুধুমাত্র ধনী শ্রেণির জন্যই নয়, সব শ্রেণির মানুষের জন্য। আমাদের তরুণ ছাত্র সমাজ রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে তা প্রমাণ করেছে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ছাত্র-জনতার ব্যাপক গণআন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত এই দিনটিকে জাতি ′শিক্ষা দিবস′ হিসেবে পালন করে আসছে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের নির্ভীক ছাত্ররা রুখে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সৃষ্ট নানাবিধ বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় বসায় লৌহমানব হিসেবে কুখ্যাত জেনারেল আইয়ুব খানকে। তিনি ক্ষমতায় এসে তার শাসন ব্যবস্থাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেষ্টা করেন। এরই ফলশ্রুতিতে তার গৃহীত অন্যান্য পদক্ষেপের সঙ্গে তিনি হাত দেন শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের মাত্র ২ মাস পরই ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন শিক্ষা সচিব এসএম শরিফকে চেয়ারম্যান করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। কমিশন একটি অন্তর্বর্তী রিপোর্ট প্রদান করে মাত্র আট মাসের মাথায় ২৬ আগস্ট ১৯৫৯ সালে। উক্ত কমিশন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের ঘৃণ্য উদ্দেশ্য ও স্বার্থের প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে; যা কিনা ইতিহাসের পাতায় ‘শরীফ কমিশন’ নামে পরিচিত। 

উক্ত কমিশনের ১১ সদস্যের মধ্যে চার জন ছিলেন বাঙালি সদস্য। তারা হলেন ড. মোমতাজউদ্দিন আহমেদ (উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়), আবদুল হক (সদস্য, ঢাকা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড), অধ্যাপক আতোয়ার হোসেন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এবং ড. এম এ রশীদ (অধ্যক্ষ, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ)। উল্লেখ্য, কমিশনের চেয়ারম্যান ড. শরিফ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬২ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এমনকি আইয়ুব খান অতি দ্রুত এই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

শরীফ কমিশনের বৈষম্যমূলক সুপারিশগুলো হলো :
(ক) শিক্ষা এবং শিল্প ক্ষেত্রের বিনিয়োগকে একই দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন।
(খ) অবৈতনিক সর্বজনীন বাধ্যতামূলক শিক্ষার ধারণা অবাস্তব (ইউটোপিয়া) বলে প্রত্যাখ্যান।
(গ) স্বল্পমূল্যে শিক্ষা প্রদানের ধারণাটি ভ্রান্ত।
(ঘ) উর্দুকে সমগ্র পাকিস্তানের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন।
(ঙ) মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার ব্যয়ের তিন-পঞ্চমাংশ শিক্ষার্থীদের বেতন-ভাতা থেকে সঙ্কুলান করা, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সমাজের বৃহত্তর অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।
(চ) মাধ্যমিক স্তরে আবাসিক শিক্ষাকে উৎসাহ প্রদান।
(ছ) কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপসহ মাধ্যমিক স্তরে কিছু আবশ্যিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি।
(জ) উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে শিক্ষা বোর্ডের ওপর ন্যস্তকরণ।
(ঝ) ডিগ্রি ও সম্মান কোর্স দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর মেয়াদিকরণ।
(ঞ) নারী শিক্ষার প্রতি উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি।

শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংকোচন নীতি কাঠামোতে শিক্ষাকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়- প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর। ৫ বছরের প্রাথমিক ও ৩ বছরের উচ্চতর ডিগ্রি কোর্স এবং ২ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্সের ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রস্তাব করা হয়। এর জন্য পাস নম্বর ধরা হয় শতকরা ৫০, দ্বিতীয় বিভাগ শতকরা ৬০ এবং প্রথম বিভাগ শতকরা ৭০ নম্বর।

শরীফ কমিশনের কয়েকটি সুপারিশকে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষা সংকোচনের জন্য উদ্দেশ্যমূলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেমন: ডিগ্রি কোর্স দুই বছর থেকে তিন বছর করা, কলেজ পর্যায়ে বছর শেষে পরীক্ষা ও তার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী বর্ষে উন্নীত হওয়ার শর্ত, অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফলাফলের শর্ত। সাধারণ পরিবারের সন্তানদের জন্য উচ্চ শিক্ষার সুযোগ একেবারেই সঙ্কুচিত করা। অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে ‘অবাস্তব কল্পনা’ বলে উল্লেখ করা হয়। মূলতো সাম্প্রদায়িকতাকে কৌশলে জিঁইয়ে রাখার প্রচেষ্টা করে এই তথাকথিত শিক্ষা কমিশন।

শরীফ কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার প্রস্তাব করে। তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার সুপারিশ নিয়ে। ক্ষমতায় এসেই আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেছিলেন, এ সময় সব ধরনের রাজনীতি ছিল নিষিদ্ধ। ছাত্ররাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষেধ করার মধ্যে দিয়েই আইয়ুব খান তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিলেন। শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম করাতে ১৫ ঘণ্টা কাজের বিধান রাখা। রিপোর্টের শেষ পর্যায়ে বর্ণমালা সংস্কারেরও প্রস্তাব ছিল। বাংলা ও উর্দুর স্থলে রোমান বর্ণমালা প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয় কমিশনটিতে। 

১৯৬২ সালে সামরিক আইন প্রত্যাহার হওয়ার সাথে সাথেই ছাত্ররা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলন জোরালোভাবে শুরু করে। এই আন্দোলন ঢাকা কলেজ থেকে শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয় তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়), ইডেন কলেজ, কায়েদে আজম কলেজ, তোলারাম কলেজসহ অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীরা। নেতৃত্বে ছিলেন ইডেন কলেজের ছাত্র সংসদের সহসভাপতি মতিয়া চৌধুরী, ঢাকা কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফারুক আহমেদসহ অনেক ছাত্রনেতা। আওয়ামী লীগের শিক্ষানীতি ও শিক্ষা অধিকার সম্পর্কে দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া ও কর্মসূচির সাথে পরিচিত জনগণ ছাত্রসমাজের শিক্ষা আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জোগায়। কিন্তু তখন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যান্ড ছিল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ কারাগারে বন্দী ছিলেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে ১৪৪ ধারার মধ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করা হয়। চলে পুলিশের গুলি, টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ। রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। ওইদিন শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে মিছিলের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। এই দিন সকাল ৯টা না বাজতেই বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমতলায় জমায়েত হলে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই মিছিল শুরু হয়।

ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে, বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা প্রাদেশিক মন্ত্রী খাজা হাসান আসকারির গাড়ি ও পুলিশের দুটি জিপে আগুন ধরিয়ে দেয়। উক্ত মিছিলটি যখন হাইকোর্ট পার হয়ে আব্দুল গনি রোডে ঢুকছিল, সে সময় পিছন থেকে পুলিশ গুলি বর্ষণ করলে তৎক্ষণাৎ নিহত হন বিআরটিসি’র বাস কন্ডাক্টর গোলাম মোস্তফা ও বাবুল। আহত হন গৃহকর্মী ওয়াজিউল্লাহ, তিনি পরের দিন মৃত্যুবরণ করেন। এই অবস্থায় মিছিলটি নবাবপুর রোডে পৌঁছালে পুলিশ রথখোলার মোড়ে ব্যারিকেড দেয় যাতে জগন্নাথ কলেজ থেকে আগত মিছিলটি এর সাথে মিলতে না পারে। ছাত্ররা ব্যারিকেড ভেঙ্গে অগ্রসর হলে পুলিশ আবার গুলিবর্ষণ করে; ফলে বহুজন আহত হন। এদিন টঙ্গীতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশের গুলিতে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিকেরও হত্যার খবর পত্রিকার পাতায় পাওয়া যায়। এছাড়া এই দিন ৫৯ জন গ্রেফতার ও ৭৩ জন আহত হন। চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে অবশ্য রাজনৈতিক নেতারা সরব হন। সোহরাওয়ার্দীসহ দশ নেতা পুলিশের গুলি বর্ষণের নিন্দা করে বিবৃতি দেন। জননেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী করাচি থেকে ঢাকা এসে গভর্নর গোলাম ফারুকের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত শরিফ কমিশন রিপোর্টের বাস্তবায়ন স্থগিত ঘোষণা করে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-ই-খুদাকে প্রধান করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এটিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন, যা ড.কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত। ১৯৭৪ সালের ৩০ মে কমিশনটি ৩৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত ৪৩০ পৃষ্ঠার একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেন। এটা একটি মূল্যবান শিক্ষা দলিল হিসেবে বিবেচিত। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা ভাবনা তার অন্যতম রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিভূমি। শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষা ব্যবস্থা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান প্রণীত অধ্যাদেশ বাতিল করেন। তিনি স্বাধীনতার পর ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সরকারীকরণ, সংবিধানে শিক্ষা বাধ্যতামূলক, শিক্ষা কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়িত করেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী করার জন্য কাজ করেছেন বঙ্গবন্ধু। 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ, ১১ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, ৪৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ ও চাকরি সরকারীকরণ, ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই ও গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোশাক প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান অতিথির পদ অলঙ্কৃত করার আমন্ত্রণ জানানো হলে, তিনি তাঁর পরিবর্তে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। ওই সময়ে তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশ নিয়ে আসেন। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের নির্মম হত্যাকাণ্ড বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়।

ড. কুদরত-ই-খুদা কমিশনের মতে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ হবে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মোট আট বছর এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মেয়াদ হবে নবম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মোট চার বছর। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি চার বছর মেয়াদী সম্মিলিত ডিগ্রি কোর্স এবং এক বছরের মাস্টার্স কোর্স চালু হবে। কমিশন প্রাথমিক স্তরে সর্বজনীন ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন, প্রচলিত অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা (১ম থেকে ৫ম শ্রেণী) ১৯৮০ সালের মধ্যে বাধ্যতামূলককরণ এবং ১৯৮৩ সাল নাগাদ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করে। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় এনে নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করে পনের বছর বয়স পর্যন্ত তাদের শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়।

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা হবে যুগপৎ তিন বছর মেয়াদী বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং চার বছর মেয়াদী সাধারণ শিক্ষা। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা হবে অধিকাংশ ছাত্রের জন্য প্রান্তিক বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং স্বল্পসংখ্যক ছাত্রের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিমূলক স্তর। বঙ্গবন্ধু সরকার স্বাধীন দেশে প্রথম যে বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তাতে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতে ৭% বরাদ্দ বেশি রেখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনার জন্য যে সংবিধান প্রণয়ন করেন তাতে তিনি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে শিক্ষার বিষয়টি উল্লেখ আছে। তাতে রয়েছে- ১৭(ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

(খ) সমাজের প্রয়োজনের সাথে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

(গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষতা দূর করার জন্য রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। 

বঙ্গবন্ধুর উচ্চশিক্ষার অবদানকে তিনটি ক্ষেত্রে বিভক্ত করা যায়। যেমন- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠন, বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন প্রদান, একটি কার্যকরী শিক্ষা কমিশন গঠন। এছাড়া ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন প্রণয়ন করেছিলেন। আইনটির মোট ১৫টি ধারা ছিল। 

১৯৭৩ সালে উচ্চশিক্ষা প্রসারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন পেশা ও বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি দেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার জীবদ্দশায় শিক্ষা সম্পর্কিত যে আইন প্রণয়ন করেছিলেন এবং বাস্তবায়নে চলমান ছিলেন সেগুলো হলো- প্রাথমিক স্কুল অ্যাক্ট ১৯৭৪, ইউনিভার্সিটি গ্রান্ড কমিশন অব বাংলাদেশ- আদেশ ১৯৭৩, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- আদেশ ১৯৭৩, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়- অ্যাক্ট ১৯৭৩, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়- অ্যাক্ট ১৯৭৩, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়- অ্যাক্ট ১৯৭৩, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিসিয়ান- আদেশ ১৯৭৩।

ড. কুদরত-ই-খুদা কমিশনের পর পর্যায়ক্রমে ১৯৭৮ সালে জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি, ১৯৮২ সালে ড. মজিদ খান শিক্ষা কমিশন, ১৯৮৭ সালে ড. মফিজউদ্দিন খানের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন, ১৯৯৭ সালে প্রফেসর শামসুল হকের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন, ২০০১ সালে প্রফেসর এম এ বারির নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিটি, ২০০৩ সালে প্রফেসর মনিরুজ্জামান মিঞার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন এবং সর্বশেষ জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে।

২০১০ সালে যে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় তা ড.কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আলোকে। ৬ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে গঠিত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী (চেয়ারম্যান) ও ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ (কো-চেয়ারম্যান) নেতৃত্বাধীন একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এটি অধ্যাপক কবীর চৌধুরি শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত। এখানে ৩০ (ত্রিশ) টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য চিহ্নিত করে সেসবের বাস্তবায়ন ও অর্জনের লক্ষ্যে পরবর্তী সাতাশটি অধ্যায়ে বিভিন্ন নীতি দর্শন, সুপারিশ ও করণীয় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’- এ স্পষ্ট করে দুটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়-

১. এটা কোন দলীয় শিক্ষানীতি নয়- জনগণ তথা জাতির আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি।

২. শিক্ষানীতি কোন অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়, এর পরিবর্তন ও উন্নয়নের পথ সব সময়ে উন্মুক্ত থাকবে। কোন ভুল-ত্রুটি হলে তা সংশোধন করা যাবে।

পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণি শেষে যথাক্রমে সমাপনী ও জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা গভীর আগ্রহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে জাতীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সুযোগের বৈষম্য দূর হয়ে, গুটিকতকের বৃত্তি পরীক্ষার সুযোগ ও কোচিং বন্ধ হয়ে এখন সকল শিক্ষার্থী সমাপনী পরক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং সে ফলাফলের ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে পরিচিত করানোর লক্ষ্যে আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা প্রচলন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। 

দেশের প্রায় অর্ধেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া সরবরাহসহ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। মাদ্রাসার কারিক্যুলাম উন্নয়ন করা হয়েছে। এবতেদায়ি ও জুনিয়র দাখিল পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে গ্রহণ করা হচ্ছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম চালু করে ভর্তি-বাণিজ্য রোধ করার কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ে এককালীন দেয় ফি ও অনুদান নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। নিরক্ষরতা দূরীকরণ থেকে শুরু করে সর্বাধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাদান এই সবকিছু একই গুরুত্বের সঙ্গে দেখাই বর্তমান শিক্ষানীতির লক্ষ্য। 

বর্তমানে মাহামারী করোনা সংক্রমণের কারণে বিশ্বব্যাপী সকল কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।এর ভয়াল থাবা শিক্ষা অঙ্গনেও লেগেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবে খুলবে তা কেউ বলতে পারে না। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা যাতে পড়া-শোনা থেকে পিছিয়ে না পড়ে; সেজন্য প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। যেমন: অনলাইনে পাঠদান, টিভিতে শ্রেণিভিত্তিক রুটিন মাফিক ক্লাস প্রদান, ইন্টারনেট ও তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে শিক্ষার্থীদের মেধাকে নানাভাবে মূল্যায়ন। শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার গুণগত মানকে সামনের দিকে ত্বরান্বিত করা- অধ্যাপক করীর চৌধুরীর শিক্ষা কমিশনের সুপারিশসমূহের মধ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ। 

অবশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে ছাত্র সমাজের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলার দামাল তরুণ ছাত্ররা বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে যে অনবদ্য অবদান রেখেছে, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

 

লেখক: মোহাম্মদ নূরুল আমীন

 

 

ডিসি/এসএসআর

হাজী সেলিম ও তার ছেলে ইরফানের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করছে দুদক