সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০ ইং, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

একজন আল্লামা শফী (রহ.), তাঁর দায় ও আমাদের করণীয়
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-০৯-২০ ১৩:৫৫:৪৬ /
ভারতকে দেখুন, কী নোংরা: ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: ঢাকা কনভারসেশন

আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.) এ ইহধামে আর নেই। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। পরিসমাপ্তি হয় একটি অধ্যায়ের। তিনি গত এক দশকে বেশ আলোচিত ছিলেন। তবে শেষ দু’বছর সমালোচনার ঝড়ও তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয়। সমালোচনার ঊর্ধ্বে তিনি সর্বজন সম্মানিত হয়েই পৃথিবীর মায়া ছাড়লেন। 

তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। ব্যক্তি জীবনে তাঁর দু’ছেলে ও তিন কন্যা থাকলেও মাওলানা আনাস মাদানী  ২০১৩ সাল থেকে নানা কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। বিশেষ করে তাঁর জন্য আল্লামা শফীর মতো একজন উস্তাদে দ্বীনকে নানা প্রশ্নের  সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত কওমী মাদ্রাসার পথচলায় ফাটল ধরে। 
হাটহাজারী মাদ্রাসা কওমী ও আলীয়া মাদ্রাসার মধ্যে সবচেয়ে বড়। জনগণের যাকাত ও দানের মাধ্যমেই শত-সহস্র শিক্ষার্থী প্রতিনিয়ত কোরআন ও হাদীসের শিক্ষা গ্রহণ করে। যেখানে বাংলাদেশের প্রায় তথাকথিত আধুনিক ইংরেজি ও বাংলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রের ব্যাপক অর্থও তাদের সংকট মেটাতে পারছেনা, সেখানে মহান আল্লাহর অলৌকিক ক্ষমতায় এখানে কোন অর্থ সংকট ছিল না। এ এক মহা বিস্ময়। 

তিনি ১৯৮৬ সালে মাদ্রাসার মুহতামিম নিযুক্তি লাভ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি মৃত্যুর মাত্র বিশ ঘণ্টা আগে তিনি এ পদ ছাড়েন ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে। তিনি পরাজয় বরণ না করলেও পরাজয় হয়েছে সকল কুচক্রীমহলের। বিশেষ করে যারা নানা প্রভাব খাটিয়ে বৃহত্তর কওমী আন্দোলনকে ধ্বংস বা ফাটল ধরাতে চেয়েছে। কেননা তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কতগুলো শিক্ষণীয় বিষয় দেশ প্রেমিক মুসলমানদের সামনে উঠে এসেছে। সেসব সমাধানে কওমী জনগণ আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাগুতের বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে। 

তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে হাটহাজারী মাদ্রাসা উম্মুল মাদারিস হয়ে দ্বীনি শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তাঁর পূর্বে এদেশে জন হৃদয়ে হাফেজ্জী হুজুর, শায়খুল হাদীস ও মুফতী ফজলুল হক আমিনী ছিলেন ন্যায়ের শিক্ষক।  একবিংশ শতাব্দীতে এদেশে তিনি হয়ে উঠেন শীর্ষ আসনে তাঁর আপন মহিমায়।  তাঁর নেতৃত্বে ২০১০ সালে এদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীদের রুখতে গঠিত হয় হেফাজতে ইসলাম। 

২০১৩ সালে ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রমাগত চক্রান্ত শুরু হলে তাঁর আহ্বানে মুসলিম জনতা নানা কর্মসূচী পালন করে। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠলে ৬ এপ্রিল ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে শান্তিপূর্ণ  সমাবেশ করে বেশ কিছু দাবী উত্থাপন করে। সেদিন তৌহিদি জনতার স্রোতে সারা বিশ্ব হতবিহবল। দিনমজুর ও অসহায় মানুষ সমাবেশে আগতদের খাবার ও পানি সরবরাহ করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে। 

হেফাজতের ১৩ দফা দাবিকে নানাভাবে বিকৃত ও ভুল ব্যাখ্যা করে এদেশের সরলমনা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয় কেবল মাত্র আল্লামা শফীর ব্যক্তিত্বের কাছে। একই বছর ৫ মে শাপলা চত্বরে পুনঃজমায়েতের পর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও অপকৌশলের পর রক্তক্ষয়ী আক্রমণের পর যে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা আধুনিক বিশ্বে বিরল। 

ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সহজে উঠে আসবে যদি দু’টি টেলিভিশন ও একটি পত্রিকা কেন সেরাতে বন্ধ হল তার উত্তর পাওয়া যায়। এ ধ্বংসযজ্ঞের পর হেফাজত মূলত তার কার্যশক্তি হারায়। আর এ অবস্থার জন্য প্রত্যেকে আহমদ শফী পুত্র মাওলানা আনাস মাদানীর গোপন আঁতাতকে দায়ী করে আসছিল। মূলত আনাস মাদানীর বিলাসী জীবন ও হেফাজতের মূল নেতাদের একের পর এক হেনস্থা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা তার দূর্বিসন্ধিকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছেন সবার মনে। 

জুনায়েত আহমদ বাবুনগরীসহ শীর্ষ নেতাদের পাশ কাটিয়ে কওমী স্বীকৃতি আদায়ের ফলে চূড়ান্তভাবে হেফাজতে ফাটল দেখা দেয়। সে ফাটলের মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব প্রকট হলে বাবুনগরীকে নিয়মিত হেনস্তা করা অভ্যাসে পরিণত হয় যার খেসারতই দিতে হয়েছে আনাস মাদানীকে। 

কিন্তু আহমদ শফীর ভুল ছিল তিনি  ৬ মে রক্তাক্ত ময়দানে সবাইকে রেখে আনাস মাদানীকে নিয়ে নিরাপদে হাটহাজারীতে প্রস্থান করেন এবং পরবর্তীতে মাদানীর কর্মকাণ্ডকে না থামিয়ে বরং তার কুমন্ত্রণাকে যাচাই না করে তার পক্ষে নীরব থাকেন। আহমদ শফী হযরত উমরের মত দৃঢ় হতে পারেননি। পারেননি সন্তানের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিচার করতে। ফলশ্রুতিতে কওমী শক্তি অনেকটাই নিঃশেষ হয়ে যায়। 

গত কয়েকদিন হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্রদের চলমান আন্দোলনের মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। এক, সরকার  ৫ মে ২০১৩ সালে বিজয়ী হয়ে যে স্বত্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছিল তা আর থাকলো না। কারণ শিক্ষার্থীরা সেদিনের ক্ষতকে মনে পুষে রেখেছে এবং ভবিষ্যতে যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে পেলে হয়তো সেদিনের হিসাব চাইবে। 

দুই, উহুদের যুদ্ধের মতো কিছু সংখ্যক মুনাফেক দ্বারা বৃহত্তর মহৎ উদ্দেশ্যকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কেবল মাত্র অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষা। তিন, মিথ্যা একদিন ধ্বংস হবেই, তা প্রমাণিত হল। চার, ভবিষ্যৎ রাজনীতির নিয়ামক শক্তির উত্থানও হতে পারে। 

এতকিছুর পরও যে বিষয়টি বিস্ময়কর ছিল, তা হল দেশের কোন স্থান থেকেই কোন কওমী মাদ্রাসার মুরব্বীরা ছাত্রদের এ আন্দোলনের বিপক্ষে সরাসরি দাঁড়ায়নি। এটি যেমন ক্ষতিকর তেমনি আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সমর্থনও বটে। 

এমতাবস্থায় সাধারণ গণতন্ত্রকামী জনগণেরও কিছু কর্তব্য আছে। প্রথমত, আল্লামা শফীর মৃত্যু পরবর্তী নেতৃত্ব যোগ্য ব্যক্তিদের তথা সর্বজন শ্রদ্ধেয় কওমী আলেমদের অতীত কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে তুলে ধরা যেন তার বা তাদের নেতৃত্বকে জনগণ আল্লামা শফীর মতো গ্রহণ করে। দ্বিতীয়ত, আনাস মাদানীর কর্মকাণ্ডকে বৃহত্তর কওমীর অপকর্ম হিসাবে কুচক্রী মহল চালিয়ে দিতে না পারে সে বিষয়ে কওমী আলেমদের পাশে পরামর্শের মাধ্যমে থাকা। তৃতীয়ত, ৫ মে ও পরবর্তী সময়ে কওমী আন্দোলনকে ঘিরে সকল মিথকে ভেঙ্গে চুরমার করা। 

এসব কাজের মাধ্যমে একদিন সত্যের বিজয় আসবেই। পরিশেষে আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রাহিমুল্লাহর) রুহের মাগফিরাত ও তাঁর সকল ভুল-ভ্রান্তির ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করব যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। 

 

লেখক: মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।



ডিসি/এসএসআর

সরকার করোনাভাইরাসকে ব্যবহার করে দুর্নীতির পাহাড় গড়েছে: ফখরুল