মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ ইং, ৫ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

চর কুকরি মুকরিতে নাইট ক্যাম্পিং
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা কনভারসেশন প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-০৯-২৬ ২০:৩৩:৪০ /
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় বাংলাদেশের করোনা ভ্যাকসিন

দ্বীপ জেলা ভোলার অন্তর্গত চরফ্যাশন উপজেলার একটি ইউনিয়ন চর কুকরি মুকরি। বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেষে এর অবস্থান। মেঘনা নদীর একটি মোহনা মিলিত হয়েছে চর কুকরি মুকরির সম্মুখে। এখানে আছে ম্যানগ্রোভ জলাভূমি ও বন্য জীব বৈচিত্র। নাইট ক্যাম্পিং এর জন্য একটি চমৎকার জায়গা এটি। চলুন জেনে নেয়া যাক চর কুকরি মুকরিতে নাইট ক্যাম্পিং এর খুটি নাটি। আশা করি এডভেঞ্চার প্রিয় ট্রাভেলার দের ভালো লাগবে।

যেভাবে যাবেনঃ

বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে প্রথমে ভোলাগামী লঞ্চে উঠতে হবে। এই লঞ্চ গুলো একটু ছোট আকারের হয়। লঞ্চ ছাড়ে ভোর ৬ টায় একটা আর ৭ টায় একটা। অন্যান্য সময়েও ছাড়ে কিন্তু ঐদিন রাতে ক্যাম্পিং এর ইচ্ছা থাকলে আপনাকে এই দুটার যেকোন একটাতেই রওনা হতে হবে। ভাড়া নিবে ৯০ টাকা প্রতিজন। লঞ্চে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টা মত যাত্রায় আপনি উপভোগ করবেন বিভিন্ন ছোট ছোট চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, রিভার জিপসি ( নৌকার বেদে), অনেকের বাড়ির একদম পাশ দিয়েই লঞ্চ যাবে যা বেশ ইন্টারেস্টিং। এরপর লঞ্চ থামবে ভোলা লঞ্চ ঘাটে। এখানে নামতে হবে। নেমে এখান থেকে যেতে হবে ভোলা বাস টার্মিনাল। ইজি বাইক,ভ্যান বা বাসে যেতে পারেন। তবে যাওয়ার দিন বাসে যাওয়াই ভালো, দ্রুত ও সহজ হবে যাওয়া, সময় বাচবে। বাসে গেলে সময় লাগবে ৩০ মিনিট মত, ভাড়া প্রতিজন ১৫ টাকা। ভোলা বাস স্ট্যান্ড থেকে চরফ্যাশনের বাসে উঠতে হবে। ডিরেক্ট বাস ভাড়া ১৪০ টাকা প্রতিজন আর লোকালে গেলে ৮০/৯০ টাকা প্রতিজন। বাসে মোটামুটি আড়াই ঘন্টা মত সময় লাগবে ডিরেক্ট বা লোকালে কমবেশি। চরফ্যাশন বাজারে বাস থেকে নামিয়ে দিবে। ওখান থেকে আরেকটা বাস ধরে যেতে হবে দক্ষিণ আইচায়, ভাড়া নিবে ৩০ টাকা প্রতিজন। দক্ষিণ আইচায় নেমে ব্যাটারি চালিত একটা রিকশা নিয়ে যেতে হবে কচ্ছপিয়া ঘাটে। এখান থেকে যেতে হবে চর কুকরি মুকরি। এখান থেকে ইঞ্জিন ট্রলারে যতে পারেন, কিন্তু সেটা ছাড়ে দুপুর ৪ টায়, এটায় গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে ক্যাম্পিং এ, তাই স্পিড বোটে যাওয়াই ভালো। স্পিড বোটে ২০০ টাকা মাথা প্রতি ভাড়া নিবে। মোটামোটি ৪০ মিনিট মত লাগে স্পিড বোটে। আপনাকে নামিয়ে দিবে চর কুক্রি মুকরির ঘাটে।

খাওয়া দাওয়া বিস্তারিত:

ক্যাম্পিং এর উদ্দেশ্যে গেলে আপনাকে বরিশাল শহর থেকে পর্যাপ্ত অয়েল ক্লথ কিনতে হবে যেটা মাটিতে বিছাবেন, সাথে পর্যাপ্ত ম্যাচ/লাইটার ও ব্যাটারিচালিত টর্চলাইট মেন্ডেটরি। রাতে নিজেরা বার্বিকিউ করতে চাইলে বার্বিকিউ এর এলুমিনিয়াম ফয়েল পেপার, রেডি মসলা,সস,লবন,ঝাল মসলা ইত্যাদি উপকরণ বরিশাল থেকেই নিয়ে নেয়া ভালো।
চর কুকরি মুকরিতে ট্যুরিস্ট দেখানোর মত একমাত্র গাইড আমার জানামতে যিনি তার " সেলিম চাচা", উনার যোগাযোগ নাম্বারঃ ০১৭৮০-১৩১০৫৮। সেলিম চাচার সাথে যাবার আগে কথা বলে জানিয়ে দেবেন কতজন যাবেন, ক্যাম্পিং করবেন কিনা। সে অনুযায়ী তাবুর ব্যবস্থা আগে থেকে করে রাখবেন। সাথে বালিশ লাগলে বালিশের কথা বলবেন। কতদিন ক্যাম্পিং করবেন সেটাও স্পষ্ট করবেন। খাবার দাবারের ব্যবস্থাও উনিই করবেন সেভাবে কথা বলে নেবেন, আমরা যেদিন গিয়েছি সেদিন দুপুর রাত দুই বেলা আর পরদিন সকালে খেয়েছি, চার্জ এসেছে প্রায় ১৭০০ টাকা (৪ জন), আইটেম ছিল ভাত,ইলিশ,মুরগী ডাল ও সকালে রুটি ও ভাজি। আমাদের চারজনের জন্য সব মিলায়ে বাজার করসে ২ টা ইলিশ ও একটা মুরগী। বার্বিকিউ করতে চাইলে সেটা আলাদা বলতে হবে, কি মাছ খাবেন সেটা জানাতে হবে। মাছ পাওয়া যায় মৌসুম অনুযায়ী। এখন পাওয়া যাবে ইলিশ, আমরাও ইলিশ ই বার্বিকিউ করেছি। ৪ টা মাঝারি জাটকা নিয়েছে ৫০০ টাকা। তবে নিজেরা জেলেদের কাছে খোজ করলে ছোট চিংড়ি বা অন্য ছোট ছোট মাছ ও পেতে পারেন বা চাইলে চিকেন বার্বিকিউ ও করতে পারবেন। ক্যাম্পিং আইল্যান্ডে বসে ডাব খেতে চাইলেও বলতে পারবেন।

যাবার দিন কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে স্পিড বোটে কুকরি মুকরি পৌছাবার পর সেলিম চাচার বাড়ি যেতে হবে বাইকে। বাইকে জন প্রতি ভাড়া ৩০ টাকা। আপনি যদি ঐদিন দুপুরে সেলিম চাচার কাছে না খেতে চান তবে কুকরি মুকরি বাজারে হোটেল আছে সেখানেও খেয়ে নিতে পারেন,খরচ কম পড়বে। দুপুরে খাওয়ার পর তখনই যেতে হবে নৌকায় করে " চর পাতিলার দুম" এ। এখানেই রাতে ক্যাম্পিং করতে হবে। যাওয়া ও ফেরার সময় আসা মিলে নৌকার চার্জ নিয়েছে ৫০০ টাকা।

ক্যাম্পিং:

ক্যাম্পিং হবে যে চর টায় তার নাম "চর পাতিলার দুম"। এটা কুকরি মুকরির মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটা অংশ, মেঘনার মোহনার বুকে জেগে ওঠা ছোট একটা অংশ। এই চরে আপনি সমুদ্র সৈকতের ফ্লেভারই পাবেন কেননা বেলাভূমির সামনেই সাগর স্পষ্ট দেখতে পাবেন, সাথে গর্জন ও শুনতে পাবেন জোয়ারের সময়। কুকরি মুকরি থেকে নৌকায় যাবার সময় খালের দুই পাশে ম্যানগ্রোভ বন দেখতে পাবেন, অনেক টাই সুন্দরবনের মত। এখানে নানা রকমের প্রাণি আছে গুইসাপ, হরিণ, শিয়াল, মেছোবাঘ ইত্যাদি। যেতে যেতে এই খাল মূল মেঘনার মোহনায় গিয়ে মিশেছে যা দেখতে পাবেন।

চর পাতিলার দুমের সৈকতের পেছনে যে জঙ্গল সেখানে ক্যাম্প করতে হবে। এক্টি তাবুতে দুইজন থাকতে পারবেন। ভালো করে আগুন করতে হবে একটা যেটা সারারাত জ্বলবে। আগুন টা খুবই ইম্পরট্যান্ট। এই চরে আপনি ছাড়া আর কেউই নাই এটা মনে রাখবেন, সেলিম চাচা শুধু খাবার দিতে রাতে একবার আসবে তারপর চলে যাবে এরপর আপনিই আপনার সঙ্গী পুরো দ্বীপে। বনের প্রচুর উইপোকা আর মশা আছে, তাই মশার কয়েল রাখতে হবে পর্যাপ্ত। আগুনের জন্য শুকনা কাঠ নিকেদের ই দ্বীপ থেকে খুজে খুজে সংগ্রহ করতে হবে। আগুনের জন্য সাথে কেরোসিন রাখতে পারেন বা সেলিম চাচাকে বললেও উনি দিয়ে যাবে। সন্ধ্যার পর শেয়ালের ডাকাডাকি অহরহ শুন্তে পারবেন সাথে সাগরের গর্জন।আর মাথার উপর মিল্কিওয়ে গ্যালক্সির স্পষ্ট ভিউ পাবেন (ছবি)। ১০:৩০ এর পর থেকে জোয়ার আসার সাথে সাথে সৈকতে পানির লেভেল ক্রমশই আপনাদের কাছাকাছি আসতে থাকবে। আমাদের সময় পানি অনেকটাই কাছে চলে এসছিল, এমন একটা পর্যায় এসছিল যে সবাই ভেবেছিলাম যে হয়তো তাবু তলিয়ে যাবে, তাই গাছে উঠার প্রস্তুতি নিয়েই রাতে ঘুমোতে গিয়েছি। যদিও সৌভাগ্যক্রমে আর আগায় নি, সামান্যর জন্যই ক্যাম্প তলিয়ে যায়নি। তবে নিম্নচাপ হলে বা জলোচ্ছাস হলে পরিস্থিত বেগতিক হতেও পারে তাই সব রকম মানসিক প্রস্তুতি রাখা ভালো।আমাদের সাথে টর্চ না থাকায় একটু সমস্যায় পড়তে হয় তাই টর্চ রাখবেন যত গুলা পারেন। গভীর রাতে জঙ্গলে বের হলে হরিণ দেখতে পাবেন।

সব মিলিয়ে এডভেঞ্চার প্রেমীদের চমৎকার লাগবে এখানে। শীতের মৌসুমে ট্যুরিস্ট আসে ঘুরতে বেশি, তাই ন্যাচারল ফ্লেভার পেতে বর্ষার পর পর যেতে পারেন। ফেরার রাস্তা আসার রাস্তার মত একই, তবে ফেরার দিন কুকরি মুকরি থেকে মাছ ধরা ট্রলারে করে আসতে পারবেন।

কিছু সচেতনতা ও সতর্কতা:

১/ এই অঞ্চলের মানুষ কিছুটা ধর্মভীরু। তাই বান্ধবীদের নিয়ে যদি এখানে ক্যাম্পিং করতে যান তাহলে মাঝে মাঝে বিব্রতকর অবস্থায় পড়লেও পড়তে পারেন,কারণ এটা এখনো অন্যন্য ট্যুরিস্ট স্পট গুলার মত হয়ে পারেনি। তাই সবার মানসিকতাও ট্যুরিস্ট ফ্রেন্ডলি না। আপনাকে আপনার অগোচরে স্থানীয় রা জাজ করবে, ভিন্ন ভাবে দেখবে যেটা অনেক সময় সুবিধা জনক পরিস্থিতি নাও হতে পারে। স্বামী স্ত্রী যেতে পারেন নির্দ্বিধায় তবে ভারী গহনা না নেয়াই ভালো। মনে রাখবেন এটা একদম সাগরের কোলঘেষা একটা চরাঞ্চল।এখানে সবাই নিত্যদিন প্রকৃতির সাথে লড়াই করে জীবন ধারণ করে।

২/ সেলিম চাচা এমনি মানুষ ভালো তবে আগে থেকে তার সাথে সব বিষয়ে খোলাখুলি চুক্তি করে নেবেন এবং অন্য যাদের কাছ থেকে যা কিছু নেবেন চুক্তি করে নেবেন। নাহলে পকেট সাবাড় হয়ে যাবে বুঝতেও পারবেন না। আমরা একরাত ক্যাম্পিং করেছিলাম কিন্তু তাবুর ভাড়া দুইরাতের জন্য নিতে চেয়েছিল, পরে জোর করায় আর নেয় নি। এরকম আরো বেশ কিছু ব্যাপার রয়েছে। তাই একটু সতর্ক হবেন।

৩/ যারা একটু দুর্বল চিত্তের তাদের এখানে ক্যাম্পিং না করাই ভালো, অন্তত শীতের আগের মৌসুমে।

৪/ দয়া করে ক্যাম্পিং এর পর আগুন খুব ভালোভাবে নিভিয়ে ফেলবেন ও বনে বা সৈকতে প্লাস্টিক বোতল বা প্যাকেট বা বর্জ্য ফেলে আসবেন না। এতে জায়গাটির পরিবেশ,জীব বৈচিত্র নষ্ট হয়।

 

লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগের ৫ দলের স্কোয়াড দেখে নিন