সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০ ইং, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

করোনায় গ্রাম শহর : মুখ ঢেকে, শূণ্য পেট!
ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-০৮-২০ ২২:১৩:৪০ /
ভারতকে দেখুন, কী নোংরা: ডোনাল্ড ট্রাম্প

গ্রামের রাস্তায় রিকশাটা যখন চলতে শুরু করলো, ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, মাস্ক পড়েননি কেন? খুব সরল ভাষায় তার উত্তর, ‘আরে বাই আমগরে করুনা হবে না, এইডা বড়লোকের রোগ। যারা এসির মাঝে থাকে তাগো হবে, যারা ঠান্ডা খায় তাগো হবে, যারা আরামে থাকে তাগো হবে। আমাগো চিন্তা নাই।’ যাইহোক আমাকে থামতে হলো আর তাকে একটা মাস্ক কিনে দিয়ে বললাম এটা মুখে পড়লে ক্ষতি নাই। গ্রামের চায়ের দোকানে বসে আছে আমজাদ মিয়া। বিরাট বক্তব্য দিচ্ছে করোনা রোগ কিভাবে চীন থেকে আমেরিকা গেলো আর কেনো এটা গ্রাম দেশে নাই। তার কথা আর যুক্তি তর্ক না শুনলে বিশ্বাস করা যাবেনা আসলে সাধারণ মানুষ কি ভাবছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। দোকানের সবাই হা করে তার কথা শোনে যাচ্ছে।

গ্রামের এক চাচী নির্বিকার ভঙ্গিতে দোকানদারী করছে কিন্তু মুখে মাস্ক নেই। মাস্ক পড়তে হয় সেটা সে জানে কিন্তু তার নিজের কোন মাস্ক নেই। তার দোকানে যত কাস্টমার আসছে-যাচ্ছে এই বন্যার মধ্যে কেউ মাস্ক পড়ে আসেনা। তাদের জিজ্ঞেস করলে সরল উত্তর এসব রোগ তাদের হবে না।
তিনি একজন শিক্ষক, শুধু তাই নয় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। একদিন অফিস সহকারী তার বাসায় কিছু কাগজে স্বাক্ষর নিতে গেলে তিনি বললেন একটু দূরেই থাকো আমার ঠান্ডা কাশি হয়েছে। কিন্তু সত্যি ঘটনা হলো সেই ব্যক্তি তখন করোনায় আক্রান্ত কিন্তু তথ্যটা অফিস সহকারীকে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছেন না। আমাদের সচেতনতার মাত্রা বোঝানোর জন্য ঘটনাটা বললাম।
একজন জনপ্রতিনিধি হঠাৎ করেই কাউকে কিছু না বলে ঢাকা চলে গেলেন। কয়েকদিন পরে জানা গেলো যে সে করোনায় আক্রান্ত কিন্তু সে এলাকা ত্যাগ করার পূর্বেও অসংখ্য মানুষের সাথে দেখা-সাক্ষাত করেছেন, মিশেছেন শতশত মানুষের সাথে। তাদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে করোনায় আক্রান্ত।
লক ডাউনের মধ্যেও বাড়িতে দাওয়াত করে খাইয়েছেন, যথারীতি আপ্যায়নকারী ব্যক্তি, তার স্ত্রী-সন্তানসহ কয়েকজন আক্রান্ত আর দাওয়াত খেয়ে যারা গেলেন তাদের একজন আক্রান্ত হয়ে মারাই গেলেন। যিনি দাওয়াত খাওয়ালেন তিনি কিন্তু খুব বড় একটা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন, সারা বছর দেশ-বিদেশে পড়ে থাকেন। অথচ তার সচেতনতার মাত্রাটা দেখুন!

গ্রামে গ্রামে চলছে বিনোদনের নানা মাত্রিক আয়োজন। দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে পার হওয়ার প্রতিযোগিতা দেখলাম আমার নিজ গ্রামে। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ ভিড় করে তা দেখছে। হাতে গুনা কয়েকজনের মুখে মাস্ক দেখলাম। একই জায়গায় পানির উপর হ্যান্ডবল খেলারও আয়োজন হয়েছে সদ্য। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এটায় মানুষের মধ্যে করোনার ভয় হচ্ছে না? তাদের জবাব ছিলো মানুষ ঘরে বসে বসে আসলে ক্লান্ত, তাই বিনোদনেরও দরকার আছে। আমি আর আলোচনা বাড়ালাম না।
এটা গেলো সচেতনতার বিষয় আর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষজন বরাবরই করোনা সময়কালে এগিয়ে ছিলো। সেদিন এক রিকশা চালকের সাথে কথা হলো। প্রথম লকডাউনের সময় তারা রিকশা চালাতে না পারলেও ধানকাটার কাজে তারা পুরো সময়টা যুক্ত ছিলেন। তাই তাদের এ সময়কালটিতে অর্থনৈতিক চাপটাকে তারা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া গ্রামে করোনার প্রভাব দেরিতে পড়ায় মানুষজন কাজের মধ্যেই থাকতে পেরেছেন। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার প্রায় ১৫ জন রিকশাওয়ালা ও কর্মজীবী মানুষের এক সাক্ষাতকারে বেরিয়ে এসেছে তারা এসময় বসে থাকেননি, বরং কাজের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় কাজে যুক্ত হয়েছেন। এগুলো আমাদের গ্রামগুলোর কিছু খণ্ডচিত্র। সদ্য গ্রামের বিভিন্ন মানুষ জনের সাথে মিশে দেখা সামান্য কিছু অভিজ্ঞতা। তবে এটা সকল জায়গায় একইরকম সেটা বলা যাবেনা। গ্রামের অসংখ্য মানুষ নানাবিধ সংকটেও এসময়ে কাটিয়েছেন। যদিও তাদের জন্য বিরাট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কিন্তু সেই বরাদ্দ তাদের হাতে পৌঁছায়নি সঠিক নিয়মে। একটা হরিলুটের সংবাদ আমরা দেখেছি। 

ঢাকা শহরের চিত্র কি ভিন্ন? এখানে সচেতনতার মাত্রাটা গ্রামের তুলনায় বেশি। কিন্তু গ্রামে মানুষের জীবন এই করোনাকালে যতটা সংকটাপন্ন মনে হয়েছে, তারচেয়ে শহরের নিম্ন, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য খুবই দুর্বিসহ এটা বলাই যায়। কারণ শহরের মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটটাই তৈরি হয়েছে এক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রের। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়মিত বেতনটাও দেয়নি। যে কারণে মারাত্মকরকম অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকি নিয়ে তাদের থাকতে হচ্ছে। এইতো যেদিন গ্রামের থেকে ঢাকা থেকে শহরের এসে পৌঁছালাম। আমি বাস টার্মিনাল থেকে আমার গন্তব্যে যেতে যেতে গণনা করে দেখেছি মাত্র ২০/৩০ ভাগ মানুষ মাস্ক পড়েছে। গড় পড়তায় পুরো ঢাকা শহরের চিত্র বা পুরো বাংলাদেশের চিত্রটা এমনই। সেটা না হয় বাদ দিলাম। মানুষের চলাফেরা ও আচরণ দ্বারা এখন আর বোঝার উপায় নাই যে দেশে করোনা মহামারী চলছে। অথচ মৃত মানুষের তালিকা প্রায় ৪ হাজার ছুই ছুই। প্রতিদিন সরকারী হিসাব অনুযায়ী আক্রান্ত মানুষ প্রায় ৩ হাজার। মারা যাচ্ছেন গড়ে ৩০/৪০ জন। যদিও সরকারের মন্ত্রীই বলছে করোনার প্রকোপ কমে যাচ্ছে, এটা এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে, ভ্যাকসিন লাগবে না। সেক্ষেত্রে আসলে মানুষের কি দোষ!
সেদিন একটা বস্তিতে ভিজিট করতে গেলাম। রিকশাটা বরাবরের মতই চাঁদ উদ্যানের লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো। গেট দিয়ে ঢুকছি সেই পরিচিত দোকানটা খোলাই ছিলো আর তার সামনে একই জটলা, রাস্তাটা বৃষ্টির পানিতে কাঁদাময়। সামনে এগুতেই ইয়ানুর আপার বাসার সামনের পানি নেয়ার জন্য বিশাল  জটলা। আমাদের দেশে ৫/৭ জন প্রায় দৌঁড়ে আসলেন, আপনেরা কই আছিলেন, কেমন আছেন এই কুশলাদির অন্ত নাই! এরই মাঝে একজন বলতে শুরু করলেন মুন্নার বাবা মারা গেছে স্ট্রোক করে। সখিনার আপার বাবাও মারা গেছে। ইয়ানুর আপার স্বামীর দোকানটা বন্ধ কেন জানতে চাইলে তার মেয়ে জানালো দোকানে মাল নাই তো খুইলা কি করমু। কিন্তু যারাই এগিয়ে এসে কথা বলতে শুরু করলেন তাদের কারো মুখেই মাস্ক নাই। এমনকি পুরো বস্তিতে ঘুরেও কারো মুখে মাস্ক দেখলাম না। কেন মাস্ক পরেন না বললে একজন স্পষ্ট করে বলে দিলো তাদের এসব রোগ হবেনা। যাই হোক সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।

মৌমিতার মা এগিয়ে এসে জানতে চাইলো এ পরিস্থিতি কবে শেষ হবে। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না, বস্তির প্রায় সকলেই কর্মহীন। বাসা বাড়ীর কাজে প্রায় কেউই নেয় না। আবার যার ৩/৪ টা কাজ ছিলো সে করছে ১ টা কাজ। তাদের জন্য আমরা কিছু করতে পারবো কিনা, কোন সহযোগিতা করা যাবে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
পানির কল থেকে ডানে ঘুরতেই কোনায় এক নারী মাটিতে কাগজ বিছিয়ে কিছু আধা নষ্ট সবজি বিক্রির চেষ্টা করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম বিক্রি হচ্ছে কেমন, সে খুব করুন মুখ করে বললো এই চলে আর কি ভাই। কি আর করমু কাম কাজ নাই, খাওন নাই তাই বসে থাকি এগুলো নিয়ে। সামনে এগুতেই শাহনাজ আপার বাসা। সামনের দোকানটায় বসে নেই সেই পরিচিত নারীটি সেই দোকানে এখন আরেকজন বসে আছে। কোথায় জানতে চাইলে বললো, তারা দেশে গেছে। এমন অনেকেই দেশে চলে গেছে বলে জানালো বস্তির মানুষেরা। অনেকেই স্থায়ীভাবেও চলে গেছেন অভাবে থাকতে না পেরে। অনেকে আবার গ্রাম থেকে ফিরেও এসেছে। কেউ কেউ ঈদের পর এখনো ফেরেনি।
শহরের নিম্ন আয়ের মানুষদের জীবনে এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে আসলো সেদিন। একটি ছোট দলের মাঝে ইনডেপথ ইন্টারিভিউ করে দেখলাম যে এ সময় কাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি মানুষ ঋণ করেছে। ১০ জনের একটা দলকে নিয়ে দেখেছি যে তাদের মাঝে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ করেছে। গড়ে তাদের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার টাকা। তাদের ভাবনার বড় বিষয়টাই হলো খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা। করোনায় তাদের জীবন জীবিকার জায়গায় প্রভাব ফেলেছে ঠিকই কিন্তু তাদের চলাফেরায় ন্যূনতম প্রভাব ফেলেনি। তারা কোন সামাজিক দূরত্ব মান্যতো করেই না বরং কাজের জন্য আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমাদের ইন্টারভিউয়ে বেরিয়ে এসেছে প্রায় ১০০ ভাগ গৃহকর্মীকে কর্মচ্যুত করা হলেও কাজে ফিরতে পেরেছেন হাতে গোনা কিছু মানুষ। যাদের মাসে ৪/৫ টা কাজ ছিলো তাদের কেউ কেউ এখন এসে খুব কষ্টে ১ কাজে যেতে পারাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে তাদের কাজে ফেরানোটাই সবচেয়ে জরুরি কাজ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। সরকারীর নীতি নির্ধারণী মহলের এ বিষয়টি খুবই আন্তরিকতার সাথে দেখা জরুরি। ঢাকা শহরের ৪০ লক্ষ নিম্ন আয়ের বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষ। যদিও এই মহামারীতে এই পরিমান আরও বাড়বে বলে আমরা মনে করি। এই মানুষদের কাজে ফেরাতে না পারলে তার সার্বিক প্রভাব পড়তে আমাদের অর্থনীতি, নাগরিক জীবন ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে। যে ছেলেটি একটা ছোট্ট দোকানে কাজ করবো কাজ হারিয়ে সে এখন বেকার আর এই বেকারত্ব তাকে বিপথগামী করতে কার্পন্য করবেনা।  তাই করোনার এই কড়াল গ্রাস থেকে এই সকল মানুষদের রক্ষা করার জন্য সরকার তরিৎ ব্যবস্থা নিবেন এটাই প্রত্যাশা। আমরা গ্রাম শহরের নিম্ন আয়ের মানুষদের অবস্থাটা দেখেছি, দেখেছি মধ্যবিত্তের সংকটও। এক কথায় এই ব্যাপক সংখ্যক মানুষের জীবন খুবই সংকটের মধ্যে পড়েছে এবং সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও সম্পাদক, পরিবেশ বার্তা।

fa_uzzal@yahoo.com

সরকার করোনাভাইরাসকে ব্যবহার করে দুর্নীতির পাহাড় গড়েছে: ফখরুল