সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০ ইং, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

আমরা ভুল নিয়মে সমাজ গঠন করেছি, সময় হয়েছে শুধরানোর!
আরাফাত মহসিন প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-০৮-২১ ২০:৫৬:৩০ /
ভারতকে দেখুন, কী নোংরা: ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: ঢাকা কনভারসেশন

একজন ছিনতাইকারের ইউটিউব সার্চবার অপশনের সাজেশনে লিখা দেখলাম, ‛ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা খেলে গণপিটুনি থেকে বাঁচবার উপায় কি?’ ইউটিউবে এই ধরণের কোনো কনটেন্ট আছে? আচ্ছা আগে একটা ছোট গল্প বলে নিই।

আরো তিন বছর আগে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে একজন ছিনতাইকারের সাথে আমার পরিচয়। আন্তঃনগর ট্রেন থেকে নামছিলাম। পকেটে মোবাইল এবং মানিব্যাগ, এই দুটো জিনিস নিয়ে আমার মস্তিষ্কে একটা সেন্সরের মতো আছে। একটু নড়াচড়া হলেই টের পাই। প্রচন্ড ভিড়ে ট্রেন থেকে নামার সময় আমার পকেটে অন্য কারো হাত বুঝতে পারি। আমি চুপিসারে ছেলেটার হাত ধরলাম। বয়স বারো কি তেরো এরকমই হবে। ছেলেটার হাতে তখন আমার মানিব্যাগ। হাস্যোজ্জ্বল মুখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে ছেলেটাকে ভিড় ঠেলে বাইরে নিয়ে এলাম। যা হলো, এটাই ছেলেটার কাছে প্রত্যাশার বাইরে। কারণ ধরা খাওয়ার সাথে সাথেই ছেলেটার মনে হয়েছে, এই বুঝি খেলাম গণপিটুনি। কিন্তু আমার মাথায় তখন দুটো প্রশ্ন এসেছে;
‛কি?’ এবং ‛কেনো?’
‛কি’ প্রশ্নের উত্তরে হলো; কেউ একজন আমার মানিব্যাগ ছিনতাই করার চেষ্টা করেছে।
আর ‛কেনো?’ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ছেলেটাকে বাইরে বের করে আনলাম। প্রথমত আমি ওর চোখে ভয় দেখেছি। কিন্তু আমার হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে ছেলেটার চাহনি পাল্টে গেছে। ছেলেটার চোখে তখন দেখেছি লজ্জা। এটাকে অনুতপ্ত হওয়াও বলতে পারি। আমি ছেলেটাকে ওর অপরাধের শাস্তি হিসেবে ওকে অনুতপ্ত হতে দিয়েছি। কিন্তু গণপিটুনি দিলে ছেলেটা হয়তো আরো ভালোভাবে ছিনতাই করা রপ্ত করতো, যাতে আর ধরা খাওয়া না যায়। আমি আমার ‛কেনো?’ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করেছি, ছেলেটা কেনো এ পেশায় আসলো সেটা জেনে। এটাই অপরাধের মূল উৎস। আমি যদি অপরাধীকে তার মূল উৎসে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে কিন্তু তাকে ভিন্ন পেশায় ঠেলে দিতে পারি। পড়াশুনা না জানা একটা ছেলে যখন রেলস্টেশনে ঘুরে ঘুরে কাজ ও খাবার কিছুই পাচ্ছিলো না, তখন থেকেই ছিনতাই পেশাতে জড়িয়ে পড়ে। আমি যাত্রাবাড়ীতে একটা চামড়ার জুতো বানানোর কারখানায় ছেলেটাকে কাজ জোগাড় করে দিয়েছি। পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি অপরাধের মূল উৎস থেকে। এই ছেলেটা নিশ্চয় কখনো ইউটিউবে ‛গণপিটুনি থেকে বাঁচার উপায়’ লিখে ইউটিউবে কন্টেন্ট সার্চ করবে না। যদি ভুল করেও পুরোনো পেশা ওকে টানে, ওর সার্চবারে সাজেশনে লিখা থাকবে, ‛ছিনতাইয়ের নেশা থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায়’।

আমি খুব ছোটবেলায় একজন মানুষকে চুরির অপরাধে গাছের সাথে সারাদিন বেঁধে রাখতে দেখেছি। সারাদিন ছোট বড় সবাই যেভাবে পেরেছে, মেরেছে। সন্ধ্যা বেলা লোকটার গায়ের অর্ধেক পোশাক খুলে রেখে, সাথে টাকা যা ছিলো রেখে দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। সেদিন রাতেই বাড়ি না ফিরে পাশের গ্রামে লোকটা আবার চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, রাতভর মার খেয়ে পরদিন সকালে ছাড়া পেয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, লোকটা চুরির পেশা কখনো ছাড়তে পারে নি। কারণ আমাদের মাথায় তখন একটিই প্রশ্ন এসেছে;
‛কি?’
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আমাদের প্রচলিত নিয়মে অপরাধের শাস্তি দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ওই মূহুর্তে আমাদের মাথায় ‛কেনো?’ প্রশ্নটিও যদি আসতো, তাহলে আমরা অপরাধটার উৎস পর্যন্ত যেতে পারতাম। হয়তো লোকটাকে তার পেশা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারতাম।

আমার পরবর্তী জীবনে অনেককেই এই ধরণের অপরাধের জন্য গণপিটুনি খেতে দেখেছি। তাতে আমার মনে হয় না অপরাধী কখনো অনুতপ্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বরং জেদ নিয়ে আরো বেশি ভয়ংকর অপরাধী হয়েছে দিনে দিনে। আমরা কখনো অপরাধগুলো নিয়ে খুব গভীরে ভাবতে চাই না। করোনাকালের এ সময়টাতে চুরি, ছিনতাই আরো বেড়ে গেছে। আবারো একই প্রশ্ন;
‛কেনো?’
উত্তরে ক্ষুধা এবং দারিদ্রতাই সবার উপরে উঠে আসবে। বড়লোক হবার জন্য কেউ চুরি, ছিনতাই করে এরকমটা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই মানুষগুলো নিতান্তই খাদ্য, বস্ত্রের মতো মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য এই ধরণের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আমরা যদি ‛কেনো?’ প্রশ্নটি করার অভ্যাস করতে পারি, তাহলে এই ধরণের অপরাধগুলো নির্মূল করা অসম্ভব বলে আমি কখনোই মনে করি না।

এবার আসি মূল কথায়।
যেই ছেলেটা ইউটিউবে গণপিটুনি থেকে বাঁচবার উপায় সম্পর্কিত কনটেন্ট খুঁজে বেড়াচ্ছে, ও যতোবার ছিনতাই করতে গিয়েছে ততোবারই ধরা খেয়ে মার খেয়েছে। ওর ভেতরে জেদ জন্মেছে; ছিনতাইটা আরো ভালো করে শিখতে হবে, যাতে আর মার খেতে না হয়। হয়তো ইউটিউবে এই ধরণের কনটেন্ট ও খুঁজে পাবে না। কিন্তু শেখার আগ্রহটা ওর কোনোদিনও মরবে না। একদিন ঠিক অনেক বড় কোনো ছিনতাইকার হয়ে যাবে। এখানে দোষটা কাদের বলতে পারবেন?
হ্যাঁ, দোষটা আমাদের! কারণ আমরা ‛কেনো?’ প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতে পারি না। আমাদের জেদ মেটাতে আমরা শাস্তি হিসেবে গণপিটুনি দেই। কিন্তু অপরাধটা কেনো করলো, সেটা ভাবি না।

আমাদের সমাজে এখন অপরাধ এবং অপরাধীর সংখ্যা কম নয়। আমরাই আমাদের সমাজে এই অপরাধীদেরকে লালন করেছি। পাখা গজাতে দিয়েছি। উড়তে শিখে গেলে পাখি আর মাটিতে নামতে চায় না। আমরা শিখেছি শুধু উড়তে শেখাতে। তাই আর মাটিতে নামাতে পারি না। আমরা ভুল নিয়মে সমাজ গঠন করেছি। আর সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্তও করে যাচ্ছি। সময় হয়েছে শুধরানোর। যদি এখনো শুধরাতে না পারি, ‛কেনো?’ প্রশ্নটি না করতে শিখি,
তাহলে একদিন ঠিক ছেলেটা ইউটিউবে এই ধরণের কনটেন্ট খুঁজে পেয়ে যাবে;
‛চুরি-ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা খেলেও যেভাবে মুক্তি পাবেন গণপিটুনি থেকে!’

 

 

লেখক: আরাফাত মহসিন
ফিচার এডিটর, ঢাকা কনভারসেশন
ই-মেইল: sjmohasin@gmail.com

সরকার করোনাভাইরাসকে ব্যবহার করে দুর্নীতির পাহাড় গড়েছে: ফখরুল