বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ ইং, ৭ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

ভারতের গোপন সেনাবাহিনীতে যেভাবে তিব্বতীরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-১০-১৭ ১৬:৫০:৪৪ /
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় বাংলাদেশের করোনা ভ্যাকসিন
নিহত তিব্বতী সেনা

কয়েক দশক ধরে পাহাড়ি উচ্চতায় যুদ্ধ করার জন্য ভারত তিব্বতী শরণার্থীদের 'গোপন' এক ইউনিটে নিয়োগ করছে। সম্প্রতি বাহিনীর এরকম একজন সৈন্যর মৃত্যুর পর এই ইউনিট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিবিসির সংবাদদাতা আমির পীরজাদা।

মৃত সেই সৈনিক নিইমা তেনজিন।এই এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ভারতীয় ও চীনা সৈন্যের মধ্যে মুখোমুখি সংঘাত হয়েছে। ভারতীয় সেনা বাহিনীর সূত্রগুলো বিবিসিকে বলেছে যে ১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যখন যুদ্ধ হয়েছিল, সেসময়কার একটি পুরনো মাইন বিস্ফোরিত হয়ে এই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।তেনজিনের পরিবারের সদস্যরা বিবিসিকে জানান, তেনজিন ভারতীয় সেনা বাহিনীর বিশেষ একটি গোপন ইউনিট স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স (এসএফএফ) এর সদস্য ছিলেন।এই সীমান্ত বাহিনী গঠিত হয়েছে মূলত তিব্বতী শরণার্থীদের নিয়ে এবং খবরে যা জানা যায় এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার।নিইমা তেনজিনও একজন তিব্বতী শরণার্থী ছিলেন এবং ভারতীয় সেনা বাহিনীতে তিরিশ বছরের বেশি কাজ করেছেন ।এই এসএফএফ সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। ভারতীয় কর্মকর্তারা কখনই এই বাহিনীর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেননি।বিজেপির উর্ধ্বতন নেতা রাম মাধব এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেন।ওই কফিন ভারত ও তিব্বতের পতাকা দিয়ে ঢাকা ছিল এবং সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে কফিনটি তার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

মি. মাধব এমনকি টুইট করে মি. তেনজিনকে এসএফএফ-এর সদস্য হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন এবং তার বার্তায় বলেছিলেন লাদাখে ভারতীয় সীমান্ত "প্রতিরক্ষায় জীবন দিলেন একজন তিব্বতী"। তবে পরে তিনি এই টুইটটি মুছে দেন। মুছে দেয়া টুইটে তিনি ওই সীমান্ত এলাকাকে ভারত-চীন সীমান্ত এলাকা না বলে ভারত-তিব্বত সীমান্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন।সরকার এবং সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কোন বিবৃতি না দিলেও ওই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের খবর ভারতের জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। অনেক সংবাদমাধ্যম একে উল্লেখ করেছে চীনের উদ্দেশ্যে ''কঠোর ইঙ্গিত'' এবং ''জোরালো বার্তা'' হিসাবে।

''এতদিন পর্যন্ত এর (এসএফএফ) কথা গোপন ছিল, কিন্তু এখন যে এটা স্বীকার করা হলো তাতে আমি খুবই খুশি,'' বলেন নামদাখ তেনজিন।''আমরা ১৯৭১ সালেও যুদ্ধ করেছি, তখনও আমাদের কথা গোপন রাখা হয়েছিল, এরপর ১৯৯১ সালে কারগিলে আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, সে কথাও গোপন রাখা হয়। কিন্তু এখন এই প্রথমবারের মত বিষয়টা স্বীকার করা হলো। আমি এতে খুবই খুশি হয়েছি।''

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধের পরই এই এসএফএফ বাহিনী গড়ে তোলা হয়।''উদ্দেশ্য ছিল যেসব তিব্বতী ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল, যাদের উঁচু পাহাড়ে গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল, বা যারা 'চুশি গানদ্রুক' নামে তিব্বতের গেরিলা বাহিনীর সদস্য ছিল তাদের ভারতীয় বাহিনীতে নিয়োগ করা। এই বাহিনী ১৯৬০এর দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত চীনের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছে,'' বলছেন তিব্বতী সাংবাদিক ও চিত্র নির্মাতা কালসাং রিনচেন।

১৯৫৯ সালে চীন-বিরোধী এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর ১৪-তম দালাই লামা তিব্বত থেকে ভারতে পালিয়ে যান এবং ভারতে একটি নির্বাসিত সরকার গড়ে তোলেন। তিনি এখনও ভারতেই বসবাস করেন। হাজার হাজার তিব্বতী তাকে অনুসরণ করে তিব্বত থেকে ভারতে পালিয়ে যান এবং ভারতে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় নেন।দালাই লামা এবং তার সাথে ভারতে পালিয়ে যাওয়া তিব্বতী শরণার্থীদের প্রতি ভারতের সমর্থন দ্রুতই ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়।১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় পরাজয় উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন প্রধান বি এন মল্লিক সিআইএ-র সহায়তায় এই এসএফএফ বাহিনী গড়ে তোলেন বলে খবরে জানা যায়।এই বাহিনী গড়ে তোলার পেছনে আমেরিকার ভূমিকা কতটা ব্যাপক ছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছ।কোন কোন সূত্র বলে, এটা পুরোই ভারতীয় উদ্যোগ ছিল, কিন্তু এর পেছনে আমেরিকার "পূর্ণ অনুমোদন" ছিল। অন্যরা বলে থাকেন, প্রায় ১২ হাজার তিব্বতীকে আমেরিকার বিশেষ বাহিনী প্রশিক্ষণ দিয়েছিল এবং এই বাহিনী গঠনের আংশিক তহবিল জুগিয়েছিল আমেরিকা।"বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ আমেরিকানরা দিয়েছিল," বিবিসিকে বলেছেন জাম্পা নামে একজন তিব্বতী শরণার্থী, যিনি ১৯৬২ সালে এসএফএফ-এ যোগ দিয়েছিলেন।"সেখানে সিআইএ-র একজন ছিলেন, যিনি ভাঙা ভাঙা হিন্দি বলতেন। তিনি আমাদের মধ্যে চারজন হিন্দি জানত, তাদের ট্রেনিং দিয়েছিলেন। আমরা বেশিরভাগই হিন্দি বুঝতাম না। ওই চারজন পরে আমাদের ট্রেনিং দেয়।"

প্রথম দিকে এই বাহিনীতে শুধু তিব্বতীদেরই নিয়োগ করা হয়েছিল। পরে তিব্বতী নয়, এমন লোকও বাহিনীতে নেয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাবরই এই ইউনিট সরাসরি কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের অধীন ছিল এবং সবসময়ই বাহিনীর প্রধান ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা"বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল চীনের সাথে চোরাগোপ্তা লড়াই করা এবং চীন থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ," বলছেন মি. রিনচেন।

চীন এসএফএফ-এর অস্তিত্ব অস্বীকার করে।"ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে নির্বাসিত তিব্বতীরা আছে এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। ভারতীয়দের এ প্রশ্ন করতে পারেন," সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলেনে একথা বলেছেন চীনা মুখপাত্র হুয়া চুনইং।"চীনের অবস্থান খুবই পরিষ্কার। তিব্বতের স্বাধীনতার জন্য কোন বাহিনীকে বিচ্ছিন্নতাকামী কার্যকলাপ চালাতে কোনরকম সুবিধা করে দেবার কোন প্রচেষ্টা কোন দেশ নিলে আমরা দৃঢ়তার সাথে তার বিরোধিতা করব," ওই মুখপাত্র বলে।চীন এখনও তিব্বতকে চীনের অধীনে একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত এলাকা বলে বিবেচনা করে।তবে ভারতে যে ৯০ হাজার তিব্বতী বাস করেন তার মধ্যে এই ঘটনার পর উদ্বেগ বেড়েছে।

তেনজিনের পরিবারের সদস্যরা এই স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশি হলেও, যেসব তিব্বতী একদিন স্বদেশভূমিতে ফিরে যেতে চান, তারা এই স্বীকৃতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হয়, তা নিয়ে কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে।বিবিসি

আলুর দাম নির্ধারণ করে দিল সরকার