রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ ইং, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বাংলা

ফররুখ গবেষণা ও অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-১০-১৯ ১৪:১৮:৪৭ /
সীমিত পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা করা হচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী

কবি ফররুখ আহমদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক কবি। তাঁর লেখনীতে সমসাময়িক অনাচার ও মানবিকতার বিপর্যয় উঠে এসেছে নিখুঁতভাবে। ব্যঙ্গ-রসাত্মক সাহিত্য নির্মাণেও তিনি ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে তথা স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর লেখনীকে নতুন আঙ্গিকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার নিরলস দায়িত্ব পালন করে চলেছেন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য-বোদ্ধা অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান।

সিরাজগঞ্জ জেলার চর বেলতৈল গ্রাম ছাড়িয়ে তিনি আজ নিজে একটি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ ষাট বছরের বেশি সময় ধরে সুস্থ সংস্কৃতির জন্য লড়ে যাচ্ছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক সংকল্পবদ্ধ লড়াকু সৈনিক হিসাবে তিনি সবার প্রিয়। কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তিনি পাঠদানে নিয়োজিত ছিলেন। খবরের কাগজ থেকে টেলিভিশন পর্যন্ত সাহিত্যকে উপস্থাপন করেছেন আদর্শিক ও দেশ প্রেমিকের মত।

লেখনীতে তিনি যেমন পটু তেমনি উপস্থিত জনতার সামনে বক্তব্য পেশ করে সাধারণ ও জ্ঞান পিপাসু মানুষের জ্ঞান ভাণ্ডারকে করেছেন সমৃদ্ধ। নিরহঙ্কারী ও মিষ্টভাষী অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন বয়সের ভার উপেক্ষা করে। তিনি প্রায় ষাটটি মৌলিক ও গবেষণাধর্মী বই লিখেন এবং শতশত প্রবন্ধ লিখেন নানা বিষয়ে। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হয়েও ইংরেজিতে বই রচনা করেন বেশ কয়েকটি। নিয়মিতভাবে কবিতা লিখে চলেছেন।

সম্পর্ক ছিল দেশের খ্যাতিমান সকল লেখকের সাথে। গবেষণা করেছেন মৌলিক গবেষকদের সাথে। সম্পাদনা করেছেন এবং করছেন অসংখ্য বই, পত্রিকা ও সাহিত্য সাময়িকী। প্রতিষ্ঠা করেছেন অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্কুল ও মাদ্রাসা। এত কিছুর পরও তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রতিভাধর কবি ফররুখ আহমদকে নিয়ে করা গবেষণার জন্য। ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন তৈরি করে তিনি পরিণত হয়েছেন একটি প্রতিষ্ঠানে। আজ ফররুখ গবেষণার কথা বললেই অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানকেই সবাই চিনে।

ফররুখ আহমদকে নিয়ে একক গবেষণা পত্রের দিক থেকে তিনি সবার শীর্ষে। কিন্তু তাঁর মৌলিকত্ব হচ্ছে ভিন্ন জায়গায়। এদেশে প্রতিষ্ঠিত কোন লেখক বা গবেষক অন্যদের জন্য সুযোগ যেমন তৈরি করেননি, কিন্তু তিনি তা করেছেন । তেমনি প্রতিভাবান লেখকদের দিয়ে ফররুখ আহমদের সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে লেখিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবুল হাশেম, আবুল ফজল, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, আবদুল কাদিও, মনিরউদ্দীন ইউসুফ, ডক্টর সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়-এর মত

শক্তিমান সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদরা ফররুখ আহমদের জীবদ্দশায় যেসব সাহিত্য সমালোচনা লিখেছিলেন সেগুলিকে যেমন একত্রিত করেছেন তেমনি সৈয়দ আলী আহসান, ডক্টর কাজী দ্বীন মুহাম্মদ, আবদুর রশীদ খান, ডক্টর আশারাফ সিদ্দকী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শামসুর রাহমান, সানাউল্লাহ নূরী, মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ, ডক্টর রফিকুল ইসলাম, ডক্টর আনিসুজ্জামান, ডক্টর আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ফজল শাহাবুদ্দিন, ডক্টর সদরুদ্দিন আহমদ, ডক্টর মুনিরুজ্জামান, তিতাশ চেীধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও মুহম্মদ নুরুল হুদার মত অতি জনপ্রিয় লেখকদের দিয়ে ফররুখ আহমদের সাহিত্য কর্মের উপর বই ও প্রবন্ধ রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন প্রত্যক্ষভাবে।

সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকের প্রতিভাবান ও প্রতিষ্ঠিত লেখক আল মুজাহিদী, মাহবুবুল হক, আবদুল্লাহ আল সায়ীদ, সাযযাদ কাদির, আল মাহমুদ, মোস্তফা জামান আব্বাসী, মুকুল চেীধুরী, আলী ইমামের মত লেখকরাও তাঁর আবেদনকে উপেক্ষা বরতে পারেননি। কিন্তু এত কিছুর পরও অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানের আত্মা ফররুখ গবেষণার ক্ষেত্রে ছিল অতৃপ্ত। ফলে তিনি নব্বইয়ের দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল উদীয়মান ও জনপ্রিয় লেখদেরও সম্পৃক্ত করেন। এখানে উল্লেখ্য মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম, ডক্টর ফজলুল হক সৈকত, ডক্টর ফজলুল হক তুহিন, আফসার নিজাম, মনসুর আজিজ, আহমদ বাসির, মুহিবুর রহিম, সায়ীদ আবু বকর, অধ্যাপক কে আহমদ আলম সহ প্রায় তিন শতাধিক পরিচিত মুখ তিনি আবিষ্কার করেন, যারা তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফররুখকে অন্য মাত্রায় অধিষ্ঠিত করেন।

অধ্যাপক রহমানের আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গবেষণায় তিনি কখনো তাঁর চিন্তাকে চাপিয়ে দেননি বা কারো উপর চাপ প্রয়োগ করেননি। তাঁর সম বয়সী অনেক গবেষক নিজস্ব চিন্তা চেতনায় আবদ্ধ থাকলেও ডক্টর সদরুদ্দিনের মাধ্যমে ফররুখ পাঠকে তিনি অন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেন এবং আধুনিক সাহিত্য তত্ত্বের মাধ্যমে ফররুখ সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য সাহিত্য-তাত্ত্বিকদের সুযোগ করে দেন।

এমন মহান ব্রতী গবেষককে ফররুখ আহমদের মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানানো সকল সাহিত্য প্রেমির কর্তব্য। তিনি সুস্থতার সাথে বাংলা সাহিত্যে ও গবেষণায় আরো বেশি অবদান রাখুক এ কামনা করছি।

 

লেখক: মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

ফুলছড়িতে শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ