মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ ইং, ৫ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

করোনার সমতলে বন্যা
নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-০৮-২৭ ১০:০৯:৫০ /
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় বাংলাদেশের করোনা ভ্যাকসিন

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বদ্বীপ। ভারতের ভূখণ্ড থেকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকাটি বাংলাদেশের উপর দিয়ে গেছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ অববাহিকা দিয়ে বৃষ্টিপাতের পানি বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে, যদিও বন্যা বদ্বীপ অঞ্চলের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। প্রতিবছর ব্রহ্মপুত্র বেসিনে জুন শেষে এবং গঙ্গা বেসিনে জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে বন্যা শুরু হয়। প্রতিনিয়ত উপকূলীয় অঞ্চল জোয়ারের পানি দ্বারা প্লাবিত হয়। উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি এলাকায় ফ্লাশ বন্যা দেখা যায়। বাংলাদেশের মানুষ মৌসুমি বন্যার সঙ্গে অতি পরিচিত। মৌসুমি বন্যা মানুষের বসতভিটা, পশু ও কৃষি ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করে। ফলস্বরূপ খাদ্য সংকটের মাধ্যমে দারিদ্র্য দেখা দেয়, যা দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক সময় আর্থিক স্বল্পতার কারণে প্রয়োজনের তুলনায় সাহায্যের পরিমাণ কম হওয়ায় বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে। সাধারণত বন্যার তীব্রতা মৌসুমি বায়ু, বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড় ও জোয়ারের পানি দ্বারা প্রভাবিত হয়। বাংলাদেশ সাব-ট্রপিক্যাল মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত। বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ২৩০০ মিলিমিটার, যদিও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এ গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১২০০ মিলিমিটার। আবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাত ৫০০০ মিলিমিটারের বেশি। বাংলাদেশে মোট ৩১০টি নদী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৭টি ট্রান্সবাউন্ডারি নদী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপন করেছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা এ বৃহৎ নদী তিনটি উৎপত্তিস্থল ভারত থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যার তীব্রতা বেড়ে যায়। তাছাড়া মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের ২০-২৫ শতাংশ অংশ প্লাবিত হয়ে সাধারণ বন্যার সৃষ্টি করে, যা ফসল, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে। উনিশ শতকে- ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে- বন্যার তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। আবার বিশ শতকে- ২০০৪, ২০০৭ এবং চলতি ২০২০ সালে- বন্যার তীব্রতা অনেক বেশি। দেশে ১৯৮৭, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যায় যথাক্রমে ৪০, ৬০ ও ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যায় ২৩৭৯ জনের মৃত্যু হয়। অপরদিকে ১৯৯৮ সালের বন্যায় প্রাণ হারায় ১০৫০ জন। কিন্তু আর্থিক ক্ষতির দৃষ্টিতে ১৯৮৮ সালে মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৪০০০০ মিলিয়ন টাকা। অপরদিকে ১৯৯৮ সালে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৪২১৬০ মিলিয়ন টাকা, যা ১৯৮৮ সালের তুলনায় প্রায় ১০২১৬০ মিলিয়ন বেশি। প্রকৃতিগতভাবে বাংলাদেশ বন্যা অধ্যুষিত দেশ। পানির সুষম বণ্টন না হওয়ায় উজানে অবস্থিত ভারতের পানি বাংলাদেশে প্রবেশের ফলে বন্যার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ জমি বন্যার পানি দ্বারা প্লাবিত হয়। আবার ২৫ শতাংশ জমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ মিটার উচ্চতায় আছে। প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, মৌসুমি বায়ুর প্রভাব, ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত পানি সমস্যা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, বনায়ন ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ বন্যার তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো নিম্নাঞ্চলের দেশগুলোতে বন্যার প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। উষ্ণতা বৃদ্ধিতে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করায় সমুদ্রের পানির উচ্চতা দিন দিন বেড়েই চলছে। আবার বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে হিমালয়ের বরফখণ্ডও গলতে শুরু করেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং হিমালয়ের বরফ গলার ফলে বন্যার তীব্রতা বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে। মনুষ্যসৃষ্ট কর্মকাণ্ডেও দেশে বন্যার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে অবৈধভাবে নদী ভরাট করছে। ফলে নদীর আয়তন ও গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্ষাকালে একটানা কয়েকদিন বৃষ্টির ফলে পানি বসতভিটার দিকে প্রবাহিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে। অনেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় নদী ভরাট করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করার ফলে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই তাৎক্ষণিক বন্যা মানুষকে পানিবন্দি করে ফেলে। অপরিকল্পিত স্লুইসগেট, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণে বর্ষাকালে অল্প বৃষ্টিতে নদীতে পলি জমে তলা ভরাট হয়ে যাওয়ায় বন্যার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় বালু ব্যবসায়ীরা নদী থেকে আহরিত বালু নদীর তীরে রেখে নদীর গতিপথে বাধা দেয়ায় বন্যা দেখা দেয়। চলতি বছরের বন্যায় বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাংশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ বন্যায় ৩০টির বেশি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। প্রায় ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় খুবই মানবেতর জীবনযাপন করেছে। মৃত্যুর সংখ্যা হিসাব করলে দেখা যায়, শতাধিক মানুষ মারা গেছে। দেশে একদিকে কোভিড-১৯, অন্যদিকে ভয়াবহ বন্যার প্রাদুর্ভাবে অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হওয়ায় অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আবার বন্যাদুর্গত এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় করোনা মহামারীর কারণে মানুষের সামাজিক দূরত্ব ও নিয়মিত হাতধোয়ার ব্যবস্থা বজায় রাখা অনেকটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ডিআইজি মিজানসহ চারজনের বিচার শুরু