মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ ইং, ৫ কার্তিক ১৪২৭ বাংলা

শরীরের উপর মোবাইল ফোনের প্রভাব
ডা. অপূর্ব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০২০-০৮-২৭ ১১:২৭:০৫ /
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় বাংলাদেশের করোনা ভ্যাকসিন
প্রতীকী ছবি

মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অলস । এই অলসতার কারণ - Inactivity । বাংলা করলে দাঁড়ায় - নিষ্ক্রিয়তা। আমি বলি - অকর্মণ্যতা । 
এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে অনেক । ২০০২ সাল থেকে ২০১৭, এই সময়কালের মধ্যে মানুষ কী পরিমান অলস হয়েছে ইউরোপে, তা গবেষণা করতে গিয়ে দেখতে পেল যে - ইউরোপে মানুষ আগের চেয়ে ২০ পার্সেন্ট বেশি অলস হয়ে গেছে । কিন্তু কেন অলস হয়ে উঠেছে ? 
শুরুতে উত্তরে বলেছিলাম - এই অলসতার কারণ - নিষ্ক্রিয়তা । 
কিন্তু কি কারনে তাহলে নিষ্ক্রিয় ?

এই শতকে একটি মাত্র জিনিস মানুষকে এতটা অলস করে দিয়েছে । সেটি হল - মোবাইল ফোন । মোবাইল ফোন ! মোবাইল ফোন ! 
মানুষ এখন টিভির চেয়ে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে বেশি অথবা মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে অনেক বেশি । এক গবেষণায় দেখা গেছে - গড়ে মানুষ এখন দৈনিক সাড়ে তিন ঘন্টা থেকে সাড়ে চার ঘন্টা মোবাইল ফোনে কাটায় । গড়ে একটি মানুষ দিনে ৫৮ বার মোবাইল ফোনটি হাতে নেয় । প্রেম ট্রেম করলে তো কথাই নেই ! উঠতে-বসতে ফোন-কেও হয়তো চুমু খায় । 

প্রতিদিন তিন ঘন্টার উপর ধরলেও বছরে একটি মানুষ ৫০ দিন মোবাইল ফোনে কাটায় । সে হিসেবে বছরে বারমাসের প্রায় দুই মাস কেটে যায় মোবাইল ফোন দেখে দেখে । জীবনের আর কী বাকী থাকে । আধুনিক মানুষের অদ্ভুত সব ব্যাপার স্যাপার । 
স্মার্টফোন মানুষকে কি আসলেই স্মার্ট করে তুলেছে ! নাকি মানুষ আগের চেয়ে আরো বেশি আনস্মার্ট জীবন যাপন করছে । যন্ত্রের সামনে বসে থাকতে-থাকতে মানুষের এই নিষ্ক্রিয়তা শরীরকেও খেয়ে ফেলে । যন্ত্রের আনন্দে বিভোর থাকে বলে শরীরের যন্ত্রণা ভুলে থাকে । কিন্তু যন্ত্র থেকে উঠিয়ে নিলে শরীর যে যন্ত্রনা শুরু করে, সেটা আবার কাটাতে পারে না । 

দেখা গেছে ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সের লোকেরা বেশি সময় এখন মোবাইল ফোনে কাটায় । কিশোর তরুণরাও এখন একই অনেক সময় দেয় ফোনে । অথচ কিশোর-তরুণদের আরো বেশি উদ্দাম এবং শারীরিক অ্যাকটিভিটিতে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল । 
মানুষ এখন গড়ে তিন ঘন্টা করে সময় দিলে তার দেড় ঘণ্টায় দেয় সোশ্যাল মিডিয়ায় । আর ঠিক এই কারনে এখন দেখা গেছে যে- ৪০ এর আগেই অনেকের শরীরে ডায়াবেটিস এবং হার্টের বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা দেখা দিচ্ছে । 

সারা পৃথিবীতে এখন প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রতি এগারোজনে একজনের ডায়াবেটিস । প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিস আক্রান্ত পৃথিবীতে । মানুষের সংখ্যা ৪ বিলিয়ন, প্রায় ছয় বিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক । 

বাংলাদেশে এখন ৭ মিলিয়ন বা ৭০ লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত । ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ১২ কোটি মানুষ হল প্রাপ্তবয়স্ক । এই ১২ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় এক কোটির কাছাকাছি লোকই ডায়াবেটিস আক্রান্ত । 

পাশের দেশ ভারতেও প্রায় ৮০ মিলিয়ন লোক ডায়াবেটিস আক্রান্ত এখন । সাথে কম বয়সে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মারা যায় এখন হার্টের বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় । ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফোনের অলস জাতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রিটিশরা । গবেষণায় দেখা গেছে যে - ব্রিটিশ জনগণ গড়ে ৩ ঘন্টা ১৫ মিনিট প্রতিদিন ফোনের পেছনে ব্যয় করে । শুধু ফোন নিয়ে অযথা বসে থাকার কারণে বছরে প্রায় ৮০ হাজার এর উপরে মৃত্যু হয় । সারা পৃথিবীতে এরকম অলসতার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে এখন মিলিয়নের মতো । 

পশ্চিমে সরকারগুলো শিশু কিশোরদের দৈনিক দেড় ঘণ্টার বেশি ফোনে সময় না দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দেন। 
বাংলাদেশ লোকজন গড়ে ৪ ঘন্টার উপরে ফোনে সময় দেয় । ৫ ঘন্টার উপরে সময় দেয় ২৮% এর মতো । এমনকি ছয় ঘন্টার উপরেও সময় দেয় ১২ পার্সেন্ট এর মতো । তার মধ্যে আবার দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় দেয় সোশ্যাল মিডিয়ায় । 

ফোনের পেছনে এই নিষ্ক্রিয়তা কিডনি থেকে শুরু করে ডিপ্রেশন, আর্থ্রাইটিস থেকে শুরু করে হজম সমস্যা, ইমিউনিটি থেকে কার্ডিয়াক সমস্যা, কত কিছুতেই যে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, নিজেরাই জানেনা । 
তাহলে কি করবেন ?

• ফোনের ব্যবহার কমিয়ে দিন । 
• নিজেকে অ্যাক্টিভ করুন এবং অ্যাক্টিভ রাখুন । 
• দৈনন্দিন জীবনে পরিশ্রমের কাজ বাড়িয়ে দিন । 
• সে সুযোগ কম থাকলে ব্যায়াম করুন, হাঁটুন । 
• ঘরে মহিলারা কাজের লোকের উপর নির্ভর না করে নিজ হাতে কাজ করুন ।
• ফোনে বেশি অলস সময় না দিয়ে প্রিন্ট ফরমেটে ভালো একটি বই পড়ুন, গান শুনুন, প্রকৃতির কাছে যান, বাগান করুন । 
• সামাজিক সাক্ষাতে গল্প করুন, ফোনে নয় সাক্ষাতে কথা বলুন । 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে এখন সবচেয়ে বেশি অসামাজিক করে তুলেছে । সামাজিক শব্দটি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করে সবচেয়ে বেশি অসামাজিক করেছে মিডিয়াগুলো । এই দানবদের হাত থেকে বেরিয়ে আসুন । অ্যান্ড্রয়েড এবং অ্যাপেল, দুটোই একটি সিস্টেম রেখেছে তাদের প্রডাক্টগুলোতে এখন । সেটি হলো - স্ক্রিন টাইম । 

আপনি কত সময় স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছেন, তার একটি সাপ্তাহিক হিসাব দেবে আপনাকে । 
আমি নিজে এটি ব্যবহার করি । কতটা সময় আমি অপব্যয় করছি এখানে, তা বুঝতে পারি এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারি । সপ্তাহে আমার স্ক্রিন টাইম সাড়ে ছয় থেকে আট ঘণ্টা মাত্র । সে হিসাবে দৈনিক আমি ৫০ থেকে ৬০ মিনিটের বেশি ফোনে সময় দেই না । ধরে নিলাম গড়ে এক ঘন্টা । 
ফেসবুকে লেখালেখি করি । শুধু আমার লেখাটি লিখতেই এখানে আসি । মুখে মুখে ছোট ছোট লেখা লিখি বলে বেশি সময় লাগেনা । এমনকি এই লেখাটিও ফোনে কফি খেতে খেতে মুখে মুখেই লিখছি । সামাজিক মাধ্যমে খুব কম মানুষের লেখা পড়ি। তারচেয়ে বড় কথা - স্বাস্থ্যকে এবং শরীরকে নিরাপদ রাখি । সেটাই জরুরি । নিজেকে উদাহরণ দিয়ে নিজের কথাগুলো এই কারণেই বলা । অ্যাক্টিভ থাকি । নিজ হাতে ঘরের কাজগুলো করি । কাজে কিংবা শপিং বা দূরে ঘুরতে যাওয়া ছাড়া কোথাও ড্রাইভ করি না । এরচেয়ে পায়ে হেঁটে যাই । কখনও হাঁটতে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে অডিও বুক শুনি । সেইভ করতে করতে সকালের নিউজটি শোনা হয়ে যায় । টিভি দেখি না তেমন । গোসল করতে করতে দিনের সবচেয়ে আনন্দময় গানটি শুনে ফেলি । রান্নাঘরে খাবারের আয়োজনে মেতে উঠলে কোন একটি ইন্টারেস্টিং ডিসকাশন ছেড়ে দেই, পডকাস্ট -এ আলোচনা শুনি । গুণী লোকদের লেকচার শুনি । সময় পেলে TED লেকচারে ২০ মিনিটের মজার কোনো আলোচনা শুনে নেই। 

কাজের সময় কাজ, পরিশ্রমের সময় পরিশ্রম, বিনোদনের সময় বিনোদন, ঘুমের সময় ঘুম । ফোনে সময় দেয়াটুকু নিয়ন্ত্রণ করুন । সামাজিক মাধ্যমে নিজের পছন্দের একটি বলয় তৈরি করুন । ভালো কোন লেখা পেলে মনোযোগ সহকারে পড়ুন । অনেক আবর্জনা এবং অপ্রয়োজনীয় লেখা পড়ে চোখ এবং মাথা নষ্ট না করুন । শরীর এবং মন দুটোই ভাল থাকবে । একমুখী কোন কিছুই ভালো নয় । ভারসাম্যের আরেক নাম জীবন ।

ডা. অপূর্ব চৌধুরী, চিকিৎসক ও লেখক।

পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ১১ দফা দাবিতে